ভারতকে আমরা কতটুকুই বা চিনি? মানচিত্রে এক দেশের সীমানার মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তার ভিতরে কত শত ভাষা, জাতিগোষ্ঠী, বিশ্বাস, স্মৃতি ও জীবনযাপন পাশাপাশি বেঁচে আছে। মূলধারার ভারতীয় সিনেমা সেই বিপুল বৈচিত্র্যের কতটুকুই বা পর্দায় তুলে ধরতে পেরেছে? এই প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে নাগাল্যান্ডের চলচ্চিত্র ‘আং’ (Angh)। এর অর্থ, কন্যাক গোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী গ্রামপ্রধান বা
গ্রামের শাসক।
নাগাল্যান্ড— ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের পাহাড়ঘেরা ছোট্ট রাজ্য। জনসংখ্যা দুই কোটিরও কম। সেই রাজ্যের কন্যাক জনগোষ্ঠীর ভাষা কন্যাক-এ তৈরি একটি ছবি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের মঞ্চে এমন স্বীকৃতি পাবে, তা সত্যিই খানিকটা অবিশ্বাস্য। আরও বিস্ময়ের বিষয়, পরিচালক থেজা রিও-র এটাই প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি। ছবির অধিকাংশ অভিনেতারও ক্যামেরার সামনে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা ছিল না। অথচ টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘আং’ জিতে নিয়েছে প্ল্যাটফর্ম পুরস্কার— একটি গুরুত্বপূর্ণ জুরি-নির্বাচিত সম্মান।
এই পুরস্কারের গুরুত্ব শুধু একটি ছবির সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০২৭ সালের অস্কারের সম্ভাব্য পথও। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কয়েকটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মনোনীত পুরস্কারজয়ী ছবি আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে, ‘আং’ অস্কারে মনোনয়ন পেয়েছে। কিন্তু একটি কন্যাক ভাষার ছবি যে এখন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের বৃহত্তর আলোচনায় প্রবেশ করেছে, সেটিই বড় কথা।
‘আং’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত তার গল্পের সরলতার মধ্যে লুকিয়ে থাকা গভীরতা। সময়টা ষাটের দশকের শুরু। কন্যাক গ্রামের বয়স্ক বংশানুক্রমিক প্রধান আং এবং তাঁর তরুণ ছেলের জীবনকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে কাহিনি। একদিকে পূর্বপুরুষের বিশ্বাস, রীতি, স্মৃতি; অন্যদিকে দ্রুত বদলে যাওয়া নতুন পৃথিবী। এই পরিবর্তনের অন্যতম বাহক খ্রিস্টধর্ম। একজন আমেরিকান মিশনারির আগমন সেই পরিবর্তনকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে। বাবা পুরনো বিশ্বাস আঁকড়ে থাকেন, ছেলে কৌতূহলী হয়ে ওঠে নতুন জগতের প্রতি। কিন্তু ছবিটি পুরনো বনাম নতুন— এই সহজ দ্বন্দ্বে আটকে যায় না। এখানেই পরিচালকের সাফল্য।
ঐতিহ্য এবং আধুনিকতা সব সময় পরস্পরের শত্রু নয়। মানুষের জীবনে তারা অনেক সময় পাশাপাশি থাকে, একে অন্যকে বদলায়, কখনও মিশে যায়। কন্যাক সমাজের ইতিহাসেও সেই জটিল পরিবর্তন ঘটেছে। এক প্রজন্মের মুখে হয়তো এখনও হেডহান্টিং-এর যুগের উল্কি, পরের প্রজন্মের হাতে গিটার। একই পরিবারের ভিতরে যেন কয়েকটি শতাব্দী পাশাপাশি হাঁটে। থেজা রিও-র ভাষায়, মনে হয় যেন সময়ের যন্ত্রে চেপে এক মুহূর্তে অতীত থেকে বর্তমানের মধ্যে চলে যাওয়া যায়।
এই সময়ের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে নাগাল্যান্ডের ইতিহাস। ১৯৬৩ সালে নাগাল্যান্ড পৃথক রাজ্যের মর্যাদা পায়। তার বহু আগেই বিভিন্ন নাগা জনগোষ্ঠীর মধ্যে খ্রিস্টধর্মের প্রসার শুরু হয়েছিল। ধর্মীয় পরিবর্তনের সঙ্গে বদলাতে থাকে সামাজিক রীতি, বিশ্বাস, পোশাক, উৎসব এবং দৈনন্দিন জীবন। বহু পুরনো প্রথা হারিয়ে যায়। কিছু থেকে যায় স্মৃতিতে, কিছু পারিবারিক জিনিসপত্রে, কিছু গল্পে। একসময় যা ছিল জীবনের স্বাভাবিক অংশ, তা ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে ‘ঐতিহ্য’।
এই হারিয়ে যাওয়ার বেদনা রয়েছে ‘আং’-এর ভিতরে। কিন্তু পরিচালক শুধুই বিলাপ করতে চাননি। তিনি দেখাতে চেয়েছেন পরিবর্তনের মধ্যে মানুষ কীভাবে নিজের পরিচয়কে বহন করে নিয়ে যায়।
এখানেই ছবিটির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—‘দৃষ্টির পরিবর্তন’। উত্তর-পূর্ব ভারতের বহু জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘদিন বাইরের চোখে দেখা হয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলের পর্যটক, প্রশাসক, মিশনারি কিংবা আলোকচিত্রীদের বিবরণে কন্যাকদের উল্কি, অস্ত্র, অলঙ্কার, যুদ্ধপ্রথা বা হেডহান্টিং বিশেষ আকর্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই দৃশ্যের আড়ালে থাকা মানুষটি অনেক সময় অদৃশ্যই থেকে গিয়েছেন।
থেজা রিও সেই দৃষ্টিভঙ্গিটিই বদলাতে চেয়েছেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল দর্শক যেন দূর থেকে কন্যাকদের না দেখে, বরং তাঁদের জীবনের ভেতরে প্রবেশ করে। ফলে কন্যাক মানুষ এখানে কোনও অজানা উপজাতি নয়, কোনও জাদুঘরের পুরনো নিদর্শনও নয়। তাঁরা ভালোবাসেন, কষ্ট পান, দ্বন্দ্বে ভোগেন, বিশ্বাস বদলান, সন্তানকে ভালোবাসেন এবং পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এই জায়গায় ‘আং’ শুধু নাগাল্যান্ডের ছবি থাকে না, হয়ে ওঠে মানুষের ছবি। ছবির দৃশ্যায়নও এই ভাবনাকে শক্তিশালী করেছে। পাহাড়, কুয়াশা, বনপথ, আগুনের আলো, অন্ধকারে মানুষের মুখ— সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক নিজস্ব জগৎ। কিন্তু প্রকৃতি এখানে শুধু সুন্দর দৃশ্য নয়। বন যেন মানুষেরই বাড়ি, তার ইতিহাসের অংশ। শহুরে চলচ্চিত্রে যেমন মুম্বাই বা নিউইয়র্ক কেবল পটভূমি নয়, তেমনই ‘আং’-এ নাগাল্যান্ডের পাহাড়ও চরিত্রের মতো উপস্থিত।
এই আবহ আরও বিশ্বাসযোগ্য করতে পরিচালক ও চিত্রগ্রাহক অ্যাডাম পিয়েতকিয়েভিচ ১৬ মিলিমিটার ফিল্মে ছবিটি ধারণ করেছেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের পুরনো ছবি ও চলচ্চিত্রের দানাদার টেক্সচার তাঁদের অনুপ্রেরণা দিয়েছে। প্রযুক্তিগত দিক থেকেও কাজটি সহজ ছিল না। ডিজিটালের মতো সঙ্গে সঙ্গে ফুটেজ দেখা যেত না। কয়েক দিন অন্তর ফিল্মের ক্যান মুম্বাইয়ে পাঠাতে হতো প্রসেসিংয়ের জন্য। অর্থাৎ শুটিং চলত অনেকটাই অনিশ্চয়তার মধ্যে।
এই ছবির আর একটি তাৎপর্য রয়েছে ভারতীয় সিনেমার বৃহত্তর পরিসরে। ভারতীয় চলচ্চিত্র বলতে আমরা প্রায়শই মুম্বাই, কলকাতা, দিল্লি, হায়দরাবাদ কিংবা চেন্নাইয়ের পরিচিত শিল্পকেন্দ্রগুলিকেই ভাবি। অথচ দেশের চলচ্চিত্রের মানচিত্র তার চেয়ে অনেক বড়। আসামের রিমা দাস, মেঘালয়ের ডমিনিক সাংমার মতো নির্মাতারা ইতিমধ্যেই দেখিয়েছেন, উত্তর-পূর্ব ভারতের গল্পও ভারতীয় সিনেমার কেন্দ্রীয় আলোচনার অংশ হতে পারে। ‘আং’ সেই মানচিত্রটিকে আরও বিস্তৃত করেছে।
নাগাল্যান্ডের চলচ্চিত্রশিল্প এখনও নবীন। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে গল্পের অভাব রয়েছে। বরং হয়তো উল্টোটা সত্যি— অসংখ্য গল্প এখনও বলা হয়নি। বহু ভাষা এখনও সিনেমার ভাষা হয়ে ওঠেনি। বহু মুখ এখনও বড় পর্দায় দেখা যায়নি। বহু স্মৃতি এখনও পরিবারের ঘরে, গ্রামের পথের ধারে, পাহাড়ের কুয়াশায় আটকে আছে।
‘আং’-এর টরন্টো জয় তাই শুধু একটি পুরস্কারের ঘটনা নয়। এটি ভারতীয় সিনেমাকে নিজের দিকে নতুন করে তাকানোর আহ্বান। ভারতের গল্প এক নয়, বহু। সেই বহুস্বরকে যত বেশি জায়গা দেওয়া যাবে, ভারতীয় সিনেমার পৃথিবীও তত বড় হবে।
অস্কারের দরজা শেষ পর্যন্ত কতদূর খুলবে, তা ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু তার আগেই ‘আং’ একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা খুলে দিয়েছে— ভারতের এমন এক জগতের দিকে, যাকে এতদিন আমরা খুব কম দেখেছি। আর পরিচালক থেজা রিও সেই আন্তর্জাতিক আলোড়নের মধ্যেও শেষ পর্যন্ত ফিরে যেতে চান নিজের নাগাল্যান্ডে। তাঁর ইচ্ছে খুব সাধারণ— বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলবেন।
হয়তো এই সরলতাই ‘আং’-এর আসল সৌন্দর্য। বিশ্বমঞ্চে পৌঁছেও ছবিটি তার মাটিকে ভুলে যায়নি। বরং সেই মাটির গন্ধ, মানুষের মুখ, পাহাড়ের নীরবতা এবং হারিয়ে যেতে বসা স্মৃতিগুলিই তাকে বিশ্বের সামনে আলাদা করে চিনিয়েছে।