বিকল্প জ্বালানি

প্রতীকী চিত্র

পশ্চিম এশিয়ার ক্রমবর্ধমান সংকট এবং হরমুজ প্রণালীতে অবরোধের আশঙ্কা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে নতুন করে অস্থির করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিকল্প জ্বালানির উপর জোর দেওয়ার আহ্বান নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। বিশেষ করে বায়োগ্যাসকে রান্নার গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ভাবার প্রস্তাব শুধু তাৎক্ষণিক সঙ্কট মোকাবিলার পথ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার দিকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

ভারত বহুদিন ধরেই জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরশীল। পশ্চিম এশিয়ার তেল সরবরাহে সামান্য ব্যাঘাতও দেশের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। তাই বিকল্প জ্বালানি উৎস খোঁজা আর বিলম্ব করার মতো বিষয় নয়, বরং তা এখন জাতীয় অগ্রাধিকারের পর্যায়ে পৌঁছেছে। বায়োগ্যাস, সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি— এই সব ক্ষেত্রেই বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বাস্তবায়ন দ্রুত করা অত্যন্ত জরুরি।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করার উপর জোর। সংস্কার যদি মানুষের জীবনে জটিলতা বাড়ায়, তাহলে সেই সংস্কারের কোনও মূল্য নেই। বরং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করা, নাগরিক পরিষেবা দ্রুত ও স্বচ্ছ করা— এই বিষয়গুলিকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে গত কয়েক বছরে কিছু অগ্রগতি হলেও এখনও অনেক পথ বাকি।


মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিভিন্ন মন্ত্রকের কাজের মূল্যায়ন এবং র‌্যাঙ্কিংয়ের বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এতে একদিকে যেমন প্রতিযোগিতার মনোভাব বাড়ে, অন্যদিকে জবাবদিহিতাও নিশ্চিত হয়। তবে এই মূল্যায়ন যেন শুধুমাত্র পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনা।

‘রিফর্ম, পারফর্ম, ট্রান্সফর্ম, ইনফর্ম’— অর্থাৎ সংস্কার করা, কাজে পরিণত করা, রূপান্তরিত করা এবং অবহিত করা— এই চারটি শব্দে প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রশাসনিক দর্শনকে তুলে ধরেছেন। কিন্তু এই দর্শন কার্যকর করতে গেলে শুধু নির্দেশ নয়, প্রয়োজন ধারাবাহিক নজরদারি এবং বাস্তবায়নের প্রতি আন্তরিকতা। অনেক সময় দেখা যায়, নীতি ঘোষিত হওয়ার পরেও বাস্তবে তার প্রতিফলন তেমন দেখা যায় না। এই ব্যবধান কমানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর লক্ষ্য নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী এবং অনুপ্রেরণাদায়ক। কিন্তু এই লক্ষ্য পূরণ করতে গেলে শুধুমাত্র বড় প্রকল্প বা পরিকাঠামো উন্নয়নই যথেষ্ট নয়। দরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক বৃদ্ধি, যেখানে গ্রাম ও শহর, ধনী ও দরিদ্র— সবাই সমানভাবে উন্নয়নের সুফল পায়। উন্নয়নের স্বপ্ন পূরণ করতে গেলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান— এই মৌলিক ক্ষেত্রগুলিতে জোর জোর দেওয়া বিশেষ প্রয়োজন।

বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ভারতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও দিচ্ছে। জ্বালানি ক্ষেত্রে আত্মনির্ভর হওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে নতুন পথ তৈরি করা সম্ভব। বায়োগ্যাসের মতো উদ্যোগ যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা গ্রামীণ অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করতে পারে। কৃষিজ বর্জ্য ব্যবহার করে জ্বালানি উৎপাদন একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা করবে, অন্যদিকে কৃষকদের জন্য অতিরিক্ত আয়ের পথও খুলে দেবে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট— সংকটই সবসময় নতুন সম্ভাবনার জন্ম দেয়। পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান অস্থিরতা ভারতকে তার জ্বালানি নীতিতে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যদি দীর্ঘস্থায়ী ও স্বনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগোনো যায়, তাহলে তা ভবিষ্যতের জন্য এক শক্ত ভিত্তি তৈরি করবে।
সরকারের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল— কথা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখা। মনে রাখতে হবে, প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি মানুষ তার ফলাফল দেখতে চায়। তাই সংস্কার হোক বাস্তবমুখী, উন্নয়ন হোক অন্তর্ভুক্তিমূলক, আর প্রশাসন হোক মানবিক— এই প্রত্যাশাই আজ দেশের মানুষের।