অরণ্যের বীর আল্লুরি সীতারাম রাজু

অহিংসা অসহযোগ পর্বে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কেবল কৃষক আন্দোলন হয়নি, জঙ্গি কৃষক আন্দোলনও হয়েছে৷ অন্ধ্রপ্রদেশে এমনই জঙ্গি কৃষক আন্দোলনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ছিল ‘রাম্পা’ অঞ্চলের আধা জনগোষ্ঠীর আন্দোলন৷ ‘রাম্পা’ অঞ্চলে (অন্ধ্রপ্রদেশে পূর্বঘাট পর্বতমালা ও গোদাবরী অঞ্চল) এই জঙ্গি অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন আল্লুরি সীতারাম রাজু (১৮৯৭-১৯২৪)। অসামান্য জনপ্রিয়তার কারণে তিনি অন্ধ্রপ্রদেশে লোকগাথায় বীরে পরিণত হন৷ ধনুক ও বাণ হাতে সন্ন্যাসীর গেরুয়া পোশাকে অন্ধ্রের বিভিন্ন স্থানে তাঁর মূর্তি দেখা যায়৷ আল্লুরি সীতারাম রাজুর নেতৃত্বে ১৯২২ সালের আগস্ট থেকে ১৯২৪ সালের মে পর্যন্ত ‘রাম্পা’ অঞ্চল গেরিলা যুদ্ধে পরিণত হয়ে ছিল৷ গান্ধীজি সীতারাম রাজুর জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছিলেন— ‘যদিও আমি তাঁর সশস্ত্র বিদ্রোহকে অনুমোদন করি না, আমি তার সাহসিকতা এবং আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।’
আল্লুরি সীতারাম রাজু শৈশব অথবা লেখাপড়া সম্বন্ধে নির্ভরযোগ্য তথ্য খুব কমই পাওয়া যায়৷ কোনও এক অজ্ঞাত কারণে তাঁকে রাজমুন্দ্রি, রামচন্দ্রপুরম, কোকনাদ, বিশাখাপত্তনম, নারাসাপুর প্রভৃতি জায়গায় পাঠানো হয়েছিল বিদ্যালয়ের শিক্ষার জন্য৷ তিনি বিশেষ আগ্রহী ছিলেন ঘোড়ায় চড়া, জ্যোতিষবিদ্যা এবং ওষুধের গুণাবলী আছে এমন গাছ-গাছড়ার সন্ধান বিষয়ে৷ আঠারো বছর বয়সে তিনি হয়ে গেলেন সন্ন্যাসী৷ আত্মিকশক্তি অর্জনের জন্য যোগে মন দিলেন তিনি৷ ঘুরে বেড়াতে লাগলেন বিশাখাপত্তনম অঞ্চল এবং গোদাবরী জেলায় পার্বত্য উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায়৷ তাঁর আত্মসংযম, জ্যোতিষবিদ্যা এবং বন্যপ্রাণীদের বশ্যতা স্বীকার করানো প্রভৃতি ক্ষমতা অর্জন করায় তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সাধারণ সরলমনা উপজাতি সম্প্রদায়ের এক বিরাট অংশ তাঁর একান্ত অনুগত হয়ে উঠল৷ সেদিক থেকে রাম্পা বিদ্রোহ ছিল মানুষের প্রতিবাদের আদিম অভিব্যক্তি, যাদের এরিখ হবসবমের ভাষায় ‘আদিম বিদ্রোহী’ (প্রিমিটিভ রেবেলস) বলা যায়৷
১৯২০ সালের মধ্যে সীতারাম রাজু গান্ধীজির মতাদর্শ এবং স্বরাজ সম্পর্কিত তাঁর বাণী ও চিন্তাধারার দ্বারাও আকৃষ্ট হন৷ তাঁর উপজাতীয় অনুগামীদের তিনি যুক্তির মাধ্যমে রাজী করিয়েছিলেন মদ্যপান ত্যাগ করতে এবং তাঁদের ঝগড়া ঝাঁটি পঞ্চায়েতের সাহায্যে মিটিয়ে নিতে৷ তাঁকে এজন্য ব্রিটিশ শাসকেরা সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতে লাগলেন এবং তাঁকে পুলিশের নজরাধীনে রাখা হল৷ কিন্তু আঞ্চলিক সহকারী কমিশনারের সাহায্যে তিনি স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ালেন৷ এই সময় থেকেই তিনি স্বরাজ সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন৷ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, অহিংস উপায়ে গান্ধীজির পরিকল্পিত স্বরাজ প্রাপ্তি এক বৎসরের মধ্যে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে৷ তাই সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বরাজ লাভ করা যেতে পারে বলে তিনি মনে করতেন৷ সেই অনুসারে তিনি স্থির করলেন যে, ব্রিটিশের বিরুদ্ধে উপজাতিদের বিদ্রোহী করে তুলবেন এবং এই বিদ্রোহে তিনি নেতৃত্ব দান করবেন৷ এই পরিকল্পনাকে উপজাতিরা সাদরে গ্রহণ করে ছিল৷ ব্রিটিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে তাঁদের অনেকদিন ধরে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়ে ছিল৷ অতীতে এই ধরনের বিদ্রোহ বহুবার হয়েছে৷ কিন্তু ১৯২২-২৪ সালের এই রাম্পা বিদ্রোহ পূর্ববর্তী বিদ্রোহের থেকে খানিকটা আলাদা ধরনের ছিল৷ এবারের বিদ্রোহ ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং পরিচালনা করেছিলেন বাইরের একজন ক্ষত্রিয় তপস্বী৷ সরকারি রিপোর্ট অনুসারে, ‘রাজুর এ ধরনের উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা কার্যকারী করার মতো সাহস ও ক্ষমতা ছিল এবং তিনি ব্রিটিশ সরকারের উচ্ছেদ সাধনের জন্য তাঁর কর্মসূচী অনুযায়ী এইভাবে ‘ফিতুরী’ আরম্ভ করে ছিলেন।’
১৯২২ সালের ২২ আগস্ট রাজু চিন্তাপল্লী পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণ করে মজুত অস্ত্রশস্ত্র দখল করে নিলেন৷ এরপর তাঁর আক্রমণ আরও তীব্র হতে থাকে, বহু আগ্নেয়াস্ত্রও তাঁর হস্তগত হয়৷ তাঁর সহিংস দুর্ধর্ষ গেরিলা রণনীতি ব্রিটিশ সরকারকে আতঙ্কিত করেছিল৷ আক্রমণগুলি সার্থকতা লাভ করায় দু’জন শক্তিশালী উপজাতীয় নেতা গাম মাল্লু ডোরা এবং গাম গন্তম ডোরা রাজুর শিবিরে যোগ দেন৷ এঁদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেছিলেন উপজাতি সম্প্রদায়ের শত-শত নরনারী৷ তাঁদের সাহায্যে রাজু এক কর্মঠ গোয়েন্দাদল গঠন করেন৷ এরা তাঁকে পুলিশের গতিবিধি সম্বন্ধে আগেই অবহিত করত৷ তাই পুলিশের কর্মসূচী রূপায়ন চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়েছিল৷ রাজু রম্পা চোদাভরম, মকারম, রামপোল, অনন্তসাগরম, ভেলাগা পালেম প্রভৃতি জায়গায় আক্রমণ করেন৷ কিন্তু লিঙ্গপুরমে তাঁর পরাজয় ঘটে৷ এর ফলে তার জনপ্রিয়তা কমে যায়৷ ১৯২৩ সালে সরকার ধরে নেয় রাজুর বৈপ্লবিক কাজকর্মের পরিসমাপ্তি ঘটেছে৷ তাই স্থানে-স্থানে বিশেষ পুলিশ বাহিনী মোতায়ন না রাখার সিদ্ধান্ত নেয়৷
এ সমস্ত হতে পারে তা সীতারাম রাজু আগেই অনুমান করেছিলেন৷ তাই তিনি আন্নাভরমে পুনরায় আক্রমণ চালান, ১৯২৩ সালের ১৮ এপ্রিল। বিভিন্ন জায়গায় যেমন কয়ুর, কোণ্ডা কাম্বেরু, মালকা নগীরী এবং এবুলুতে নতুন করে আক্রমণ শুরু করেন৷ কিছু দিনের মধ্যে তার বিশ্বস্ত অনুচর গামমাল্লু ডোরা পুলিশের হাতে বন্দী হন৷ সরকারও তার নীতি পরিবর্তন করে থানায় অস্ত্র মজুত করা বন্ধ করে দেয়৷ এই অবস্থায় স্বভাবতই রাজুর পর্যাপ্তভাবে অস্ত্র সংগ্রহের পথ বন্ধ হয়ে যায়৷ ওই বৎসর কাকিনাড়ায় অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে যোগ দিয়ে সমতলের স্বাধীনতা আন্দোলন পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন৷ ১৯২৪ সালের সীতারাম রাজুকে বাগে আনতে সরকার আসাম রাইফেলের ১২০০ সেনা আনল৷ রাম্পা বিদ্রোহ দমন করতে মাদ্রাজ সরকার ১৫ লক্ষ টাকা ব্যয় করল৷ ফলে রাজুর কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে৷ এই সময় রাদার ফোর্ড নামে একজন জাঁদরেল এবং অভিজ্ঞ ইংরেজকে এলাকা নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব দেওয়া হয়৷ তা সত্ত্বেও রাজু ১৯২৪ সালের ৬ মে পর্যন্ত সেনাবাহিনীর হাত এড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন৷ ১৯২৪ সালের ৬ মে আল্লুরি সীতারাম রাজুকে পুলিশ হত্যা করে৷ কৃষ্ণাদেবীপেটে তাণ্ডব নদীর তীরে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়৷ সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়— পালানোর সময় সীতারাম রাজুকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে৷ ভুয়ো সংঘর্ষে হত্যা, যা প্রায়ই যে কোনও সরকার প্রতিবাদীদের দমন করার জন্য করে থাকে এবং যার বিরুদ্ধে আজকের আর্ন্তজাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলি সরব, সেই কৌশলের প্রয়োগ ১৯২৪ সালের অন্ধ্রপ্রদেশে দেখা গিয়েছিল৷
সীতারাম রাজুর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে ‘রাম্পা’ প্রতিবাদী অভ্যুস্থানের পরিসমাপ্তি ঘটে৷ সীতারাম রাজুর সাহস, আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার জন্য প্রাণদান চিরস্মরণীয় হয়ে আছে৷ ভারত সরকার তাঁর সম্মানে ডাক টিকিটও প্রকাশ করে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভীমাবরম অঞ্চলে তাঁর ত্রিশ ফুট ব্রোঞ্চের মূর্তি উন্মোচন করেন৷ সম্প্রতি তিনি সীতারাম রাজুর নামে অন্ধ্রে বিমানবন্দরের নামকরণ করেন৷ তাঁর নামে সিনেমাও হয়েছে৷ অন্ধ্রপ্রদেশের বিভিন্ন শহর আদিবাসী এলাকায় এবং চকে তাঁর বহু মূর্তি ও আবক্ষ মূর্তি রয়েছে৷ এ থেকে অনুমান করা যায় সাধারণ মানুষের হৃদয় জুড়ে রয়েছে সীতারাম রাজুর নাম৷