রাজনৈতিক প্রতিবাদে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু সেই প্রতিবাদস্থলে কর্তব্যরত মহিলা সাংবাদিকদের সঙ্গে পুলিশের যৌন হেনস্থা বা অশালীন আচরণের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি আর নিছক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্ন থাকে না। তখন প্রশ্ন ওঠে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, নাগরিকের প্রতিবাদের অধিকার এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সম্পর্ক নিয়ে। দিল্লিতে তিন মহিলা সাংবাদিক পুলিশের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থা ও অনভিপ্রেত স্পর্শের যে অভিযোগ করেছেন, তার নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত হওয়া জরুরি। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াও প্রয়োজন।
প্রতিবাদ মিছিল বা জমায়েত নিয়ন্ত্রণ করা পুলিশের দায়িত্ব। প্রয়োজন হলে ব্যারিকেড সরানো, বিক্ষোভকারীদের আটক করা কিংবা বেআইনি জমায়েত ছত্রভঙ্গ করাও পুলিশের আইনি ক্ষমতার মধ্যে পড়ে। কিন্তু সেই ক্ষমতা কখনও সাংবাদিককে অপমান, ভয় দেখানো বা শারীরিক ভাবে হেনস্থা করার অনুমতি দেয় না। একজন সাংবাদিক প্রতিবাদস্থলে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েছেন বলেই তাঁর পেশাগত ও নাগরিক অধিকার শেষ হয়ে যায় না।
বরং প্রতিবাদস্থলে সাংবাদিকের উপস্থিতির গুরুত্ব আরও বেশি। পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের সংঘাতের সময় কী ঘটছে, তার একটি নিরপেক্ষ নথি তৈরি করেন সাংবাদিকেরা। তাঁদের ক্যামেরা, নোট এবং প্রতিবেদন সাধারণ মানুষকে ঘটনার বাস্তব চিত্র জানতে সাহায্য করে। সেই সাংবাদিকরাই যদি পুলিশের আচরণের শিকার হন, তাহলে শুধু একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তাই ক্ষুণ্ণ হয় না, জনসাধারণের কাছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার সম্পর্কে স্বাধীন তথ্য পাওয়ার পথও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে দিল্লি পুলিশের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ তদন্তের জন্য ক্রাইম ব্রাঞ্চে পাঠানো হয়েছে—এটি প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে, কিন্তু এখানেই দায়িত্ব শেষ নয়। অভিযোগকারীদের যাতে কোনও রকম চাপ বা ভয় ছাড়াই বক্তব্য জানাতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ, সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার ছবি এবং অন্য কোনও প্রাসঙ্গিক প্রমাণ দ্রুত সংরক্ষণ করা দরকার। তদন্ত এমন হতে হবে, যাতে তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে পরে প্রশ্ন না ওঠে। আইন যতটা অনুমতি দেয়, তদন্তের ফলাফলও প্রকাশ্যে আনা উচিত।
তবে অভিযোগ উঠেছে বলেই অভিযুক্ত পুলিশকর্মীদের আগেই দোষী ধরে নেওয়া যায় না। গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচারের মূলনীতি একই থাকে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করতে হবে, আবার অভিযুক্তদেরও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তই এই দুই দিকের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে।
এই ঘটনার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। যে প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে ঘটনাটি ঘটেছে, তার সঙ্গে নির্বাচনী তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক জড়িয়ে আছে। ইতিমধ্যেই এই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে অবিশ্বাস ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের আচরণ নিয়ে সামান্য সন্দেহও রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। আর সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ সেই অবিশ্বাসকে আরও গভীর করতে পারে।
গণতন্ত্রের পরীক্ষা শুধু ভোটের দিনে হয় না। রাস্তায় মানুষ যখন সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন, সাংবাদিক যখন সেই প্রতিবাদ তুলে ধরেন এবং পুলিশ যখন আইন প্রয়োগ করে— সেই মুহূর্তেও গণতন্ত্রের পরীক্ষা হয়। রাষ্ট্রের শক্তি তার ক্ষমতা প্রয়োগে নয়, সেই ক্ষমতার সীমা মেনে চলার মধ্যেই প্রকাশ পায়।
তাই অভিযোগ সত্য হলে কোনও রাজনৈতিক চাপ, পাল্টা অভিযোগ বা প্রশাসনিক আত্মরক্ষার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত এবং দায় নির্ধারণ। আইনের রক্ষকরাও আইনের ঊর্ধ্বে নন— এই বিশ্বাস অটুট রাখাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।