শতবর্ষে আকাশবাণী কলকাতা: স্মৃতির বিস্তার, ভবিষ্যতের ধ্বনী…

Photo: Facebook

কলকাতার বাতাসে সুর আর শব্দের এক অদৃশ্য জাল বোনা আছে বহু দশকের। সেই জালের কেন্দ্রবিন্দু গার্স্টিন প্লেস কিংবা বিধান সরণির ‘আকাশবাণী ভবন’। সময়টা ১৯২৭ সালের ২৬ আগস্ট। ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কম্পানির (IBC) অধীনে ১ নম্বর গার্স্টিন প্লেসের একটি ভাড়াবাড়িতে অতি সাধারণভাবে পথচলা শুরু করেছিল কলকাতা বেতার কেন্দ্র। পরবর্তীকালে যা রূপান্তরিত হয় ‘আকাশবাণী কলকাতা’-য়। ভারতীয় উপমহাদেশের যোগাযোগ, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের এক প্রামাণ্য দলিল এই বেতার কেন্দ্রটি আজ তার প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ স্পর্শ করতে চলেছে ২৬ আগস্ট। শতবর্ষে দাঁড়িয়ে আকাশবাণী কলকাতা কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার কেন্দ্র নয়, বরং আধুনিক বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ও মানসিক বিকাশের এক দীর্ঘতম সারথি।

বেতারের যাত্রা শুরুতে বাঙালির গৃহকোণে রেডিও পৌঁছানোটা ছিল এক বৈপ্লবিক ঘটনা। মারকনি-র (Marconi) তরঙ্গ প্রযুক্তিকে বাঙালির অন্তরের সুরের সঙ্গে বেঁধে দিয়েছিলেন একদল রূপকার। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, পঙ্কজকুমার মল্লিক, বাণীকুমার, রায়চাঁদ বড়াল—- এঁদের যৌথ সাধনায় বেতার কেবল সংবাদ প্রচারের যন্ত্র থাকেনি, হয়ে উঠেছিল শিল্পের নন্দনকানন। ১৯৩১ সালে সূচনা ঘটেছিল সেই কালজয়ী সৃষ্টি ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত চণ্ডীপাঠ আর পঙ্কজ মল্লিকের সুরারোপে আশ্বিনের ভোরে যে স্বর্গীয় আবহ সৃষ্টি হয়েছিল, তা আজও বাঙালির শারদোৎসবের আবহমান আগমনী বার্তা। ৯৫ বছর পেরিয়ে আজও এক বারের জন্যও যার আবেদন ম্লান হয়নি, তা বিশ্ব সম্প্রচার ইতিহাসেরই এই এক বিরল অলৌকিক ঘটনা।

আকাশবাণী কলকাতার অবদান কেবল সংগীত বা বিনোদনে সীমাবদ্ধ ছিল না, বাঙালি চিন্তন, সাহিত্য ও নাট্যচর্চাকে এটি এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং এ কেন্দ্রের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। ‘আকাশবাণী’ নামটি রবীন্দ্রনাথের দেওয়া, যা পরে নিখিল ভারত বেতারের অফিশিয়াল নাম হিসেবে গৃহীত হয়। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বনফুল, বুদ্ধদেব বসু থেকে শুরু করে প্রেমেন্দ্র মিত্র— তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় সাহিত্যিকদের নিয়মিত পদচারণা ছিল এখানে। বিশেষ করে ‘বেতার নাটক’ বাঙালির ড্রয়িংরুমে নাট্যচর্চার নতুন ব্যাকরণ তৈরি করেছিল। ‘শ্রীমন্ত’, ‘পল্লীসমাজ’ বা বিভিন্ন শ্রুতিনাটকের সম্প্রচার লক্ষ লক্ষ শ্রোতাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত। শিশু ও কিশোরদের জন্য ‘শিশুমহল’ কিংবা ‘গল্পদাদুর আসর’ তৈরি করেছিল এক নতুন কল্পলোক।


সংবাদ সম্প্রচার বা সামাজিক দায়বদ্ধতায় আকাশবাণী কলকাতার ভূমিকা ঐতিহাসিক। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলিতে আকাশবাণী কলকাতা কেবল একটি প্রচার মাধ্যম ছিল না, ছিল মুক্তিযুদ্ধের কণ্ঠস্বর। দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্ঠে ‘সংবাদ পরিক্রমা’ এবং বিশেষ সংবাদ পর্যালোচনা শোনার জন্য ওপার এবং এপার বাংলার মানুষ অধীর আগ্রহে রেডিওর নব ঘোরাতেন। সীমানার প্রাচীর ভেঙে শব্দ কীভাবে দুটি বাংলার মানুষকে এক সূত্রে বাঁধতে পারে, তার উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত ছিল সেই দিনগুলি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত— বাঙালির কাছে কোনও খবরের নির্ভরযোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি ছিল, ‘খবরটা কি আকাশবাণীতে দিয়েছে?’

কৃষি ও পল্লীউন্নয়নে আকাশবাণী কলকাতার ভূমিকা অনস্বীকার্য। ‘পল্লীমঙ্গল’ এবং ‘কৃষিকথা’ অনুষ্ঠানগুলি গ্রাম বাংলার চাষি ও সাধারণ মানুষের কাছে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্য সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল। শহরকেন্দ্রিক মিডিয়ার যুগেও আকাশবাণী বরাবরের জন্য গ্রামীণ জনজীবনের পালস ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।

তবে শতবর্ষের এই গৌরবজ্জ্বল মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আত্মতুষ্টির স্থান নেই, সময় এসেছে এক কঠিন আত্মসমীক্ষার। একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তির প্রবল জোয়ার, ডিজিটাল মিডিয়ার আগ্রাসন, স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেটের যুগে তথাকথিত ‘রেডিও কালচার’ আজ এক তীব্র সংকটের মুখে। যে মিডিয়ামটি ছিল দৃশ্যহীন অথচ কল্পনাময়, তা আজ দৃশ্যভিত্তিক এবং অতি-দ্রুত বিনোদনের যুগে শ্রোতা হারাচ্ছে—- এমন অভিযোগ সর্বত্র। গার্স্টিন প্লেসের ঐতিহ্যবাহী ভবনটি আজ আর নেই, আর বিধান সরণীর ভবনটিতেও আধুনিকতার প্রলেপ পড়লেও কোথাও যেন এক অদৃশ্য শূন্যতা গ্রাস করছে।

কিন্তু শতবর্ষের বার্তা কি কেবলই অতীত রোমন্থন? একেবারেই নয়। আকাশবাণী কলকাতার শক্তি তার প্রামাণ্যতায়, তার বিশুদ্ধতায়। আজকের ফেক নিউজ ও চাঞ্চল্যকর মিডিয়ার ভিড়ে আকাশবাণীর সংবাদের নিরপেক্ষতা এবং ভাষার শুদ্ধতা আজও অতুলনীয়। এই শক্তিকে মূলধন করেই তাকে নতুন যুগে পা রাখতে হবে। রেডিও আজ আর কেবল একটি কাঠের বাক্সে সীমাবদ্ধ নেই, তা চলে এসেছে পডকাস্ট, মোবাইল অ্যাপ (যেমন— News On Air) এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। আকাশবাণী কলকাতার কাছে যে অমূল্য এবং বিরল আর্কাইভ (আর্কাইভাল অডিও) রয়েছে— রবীন্দ্রনাথের নিজের কন্ঠ, নেতাজির ভাষণ, শাস্ত্রীয় সংগীতের মহীরুহদের পরিবেশনা, কালজয়ী নাটক— তা আধুনিক ডিজিটাল ফরম্যাটে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া শতবর্ষের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।

শ্রোতাদের অভ্যাসের পরিবর্তন ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু ভালো কনটেন্টের চাহিদা কমেনি। এফএম বাংলা বা অন্যান্য চ্যানেলের মাধ্যমে উপস্থাপনায় তরুণ প্রজন্মের উপযোগী সতেজতা আনা প্রয়োজন, তবে তা যেন ঐতিহ্য ও ভাষার মানকে ক্ষুণ্ণ না করে। আকাশবাণী কলকাতাকে আবার হয়ে উঠতে হবে চিন্তাশীল আলোচনা, বিশুদ্ধ সংগীত এবং সৃজনশীল সাহিত্যচর্চার মুক্তাঙ্গন।

১০০ বছর আগে যে তরঙ্গের সূচনা হয়েছিল, তা থামেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুধু তার মাধ্যম বদলেছে। শতবর্ষের এই ঐতিহাসিক ক্ষণে দাঁড়িয়ে আকাশবাণী কলকাতা কেবল একটি স্মারক স্তম্ভ নয় বরং এক চলমান ইতিহাস। প্রযুক্তি বদলাবে কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের শব্দের মাধ্যমে সংযোগ স্থাপনের যে আত্মিক যোগসূত্র আকাশবাণী কলকাতা গড়ে তুলেছে, তা অমলিন। আকাশবাণী সুরময় বার্তা যেন নতুন শতকেও বিশ্বজুড়ে বাঙালির হৃদয়ে অনুরণিত হয়— ‘আকাশবাণী কলকাতা, খবর পড়ছি…’৷