ডিসেম্বরের বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের ব্যবধান মাত্র দু-মাসের। এটা সবার জানা। কিন্তু বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে সেখানকার ঘটনাবলী আগামী ২০২৬ এর ডিসেম্বরে কী হতে চলেছে, তা মাত্র দু’মাস আগেও সঠিক ভাবে বলা হয়ত একটু মুশকিল। ঘটনাবলী বলতে অবশ্যই একটা ঘটনার কথাই আলোচ্য— সেটা হল বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যেই যে ঘোষণা করেছেন তিনি আগামী ২০২৬ এর ডিসেম্বর মাসেই দেশে ফিরবেন— সেটা বাস্তবে আদৌ হয় কি না? এখন সবার নজর সেইদিকেই।

শেখ হাসিনার বয়স এখন ৮০। ফলে ওঁর জীবনের শেষপ্রান্তে এসে ওঁর পরবর্তী পদক্ষেপে বা সিদ্ধান্তে যে বয়সের একটা প্রভাব পড়বে সেটা বলাই বাহুল্য। অর্থাৎ তাঁর সংগ্রাম তথা প্রধানমন্ত্রিত্ব এই দুয়েরই একটা অবিসংবাদিত ভাবমূর্তি বজায় রাখতে তাঁর জীবন কাহিনীর শেষ অধ্যায় যে বাংলাদেশেই অতিবাহিত হওয়া দরকার, এটা যে কেউই বুঝবে। দেশে ফিরলে অনেক কিছুই হতে পারে, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, তাঁর ফাঁসি হতে পারে, তাঁকে হত্যা করা হতে পারে, এরকম সব সম্ভাবনাই রয়েছে। এই উপমহাদেশের রাজনীতি নিয়ে যারা চর্চা করেন তাঁদের মতে, শেখ হাসিনার কাছে অন্য বিকল্প খুব একটা নেই। কারণ, তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায় দেশের বাইরে হলে তার আবেগ, সম্মান, তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘস্থায়ী ছাপ, কোনওটাই বাংলাদেশের ভেতর সেভাবে পড়বে না। ফলে তিনি ফিরবেন বলে অনেকেরই ধারণা, আর সে ঘোষণা তিনি নিজেই একাধিকবার করেছেন। আওয়ামী লীগের বক্তব্য এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবে দল। তবে যারা খবর রাখেন তাঁরা ভালই জানেন যে, শেখ হাসিনার কাছে দল মানে কিন্তু তিনিই। মানে দাঁড়ায় তাহলে সিদ্ধান্তটা হবে তাঁর নিজেরই। কিন্তু আবার উপমহাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাবলীর যাঁরা খেয়াল রাখেন, তাঁরা বলেন যে এই সিদ্ধান্তে মার্কিন এবং ভারত সরকারেরও একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।

ভারতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং বিশিষ্ট মার্কিন কূটনীতিক সার্জিও গোরের আরেকটা বড় কূটনৈতিক দায়িত্ব আছে— তিনি হলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া সংক্রান্ত বিষয়ের বিশেষ দূত। তিনি কিছুদিন আগে ঢাকা গিয়েছিলেন এবং সেখানে তিনি বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে এক একান্ত প্রাতঃরাশ বৈঠকে মিলিত হন। এই বৈঠকের ব্যাপারে ঢাকার ভারত ও মার্কিন দূতাবাস প্রথমে নীরব ছিল। পরে মার্কিন দূতাবাস বৈঠকের কথা স্বীকার করে, তাও আবার শুধু মার্কিন দূতাবাস সূত্রে পাওয়া খবর হিসেবে। তবে বৈঠকের আলোচ্য বিষয় নিয়ে কোনও দেশের পক্ষ থেকেই কিছু বলা হয়নি। উপমহাদেশীয় রাজনীতির বর্তমান গতিপ্রকৃতিতে এই বৈঠকের গুরুত্ব অপরিসীম। আবার ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল গত ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় গিয়ে বাংলাদেশের সেনা প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে বিভিন্ন মহলে বলা হচ্ছে। তবে এ ব্যাপারেও কোনও সরকারি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। আবার বলা হচ্ছে, শেখ হাসিনা যদি বাংলাদেশে ফেরেন তাহলে সে দেশে তাঁর নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন ডোভাল৷ সীমান্ত এলাকায় ক্রমবর্ধমান আইএসআই মদতপুষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠীর উপস্থিতি এবং সম্ভাব্য নাশকতা নিয়ে তিনি গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করেছেন বলেও খবর। এসবের সত্যতা কোনও সরকারি পর্যায় থেকে পাওয়া যায়নি।


তবে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে ভারত, ইউরোপ বা আমেরিকায় আওয়ামী লীগের যে বহুসংখ্যক শীর্ষ নেতা এখন রয়েছেন তাঁদের অনেকেই দেশে ফিরবেন বলে ধারণা। কারণ, না ফিরলে তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। ফলে ফিরলে দেশে তাঁদের জন্যে কী অপেক্ষা করছে, সেটা না ভেবেই তাঁদেরও ফেরা ছাড়া অন্য বিকল্প খুব একটা যে নেই সেটা তাঁরাও বুঝতে পেরেছেন। অন্যদিকে ইউরোপ, আমেরিকা, বিশেষত যুক্তরাজ্য, গ্রিস, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশের আওয়ামী লীগ দলের শীর্ষ নেতৃত্ব সম্প্রতি কলকাতায় এসেছিলেন। তাঁরা শেখ হাসিনার জীবনের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী নিয়ে একটা চলচিত্র নির্মাণ করেছেন। এক সাংবাদিক সম্মেলনে তাঁরাও জানালেন যে, নেত্রীর সঙ্গে তাঁদের অনেকেই দেশে ফিরতে প্রস্তুত। তবে কীভাবে তাঁরা যাবেন, কৌশলগত কারণে তাঁরা তা এখনই জানাতে চাননি। তাঁরা বিদেশে থাকলেও তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধারায় মামলা করা হয়েছে বাংলাদেশে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ইউনূস সরকারের সময়ের চেয়ে একটু ভাল হলেও সামগ্রিকভাবে বেশ খারাপ। জানা গিয়েছে, বিএনপি-পন্থী বড়, ছোট ব্যবসায়ীরাও চাইছেন শেখ হাসিনা দেশে ফিরুন৷ কারণ তাহলে নাকি তাঁদের মতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কারণ চাঁদাবাজির ফলে তাঁরা এতটা উত্যক্ত যে, তাঁদের পক্ষে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া মুশকিল হয়ে পড়েছে। তাঁদের বক্তব্য, আওয়ামী লীগ আমলে চাঁদার ব্যাপারটা একটা ব্যবস্থাপনার মধ্যে দিয়ে হত এবং তা ছিল সুনির্দিষ্ট। কিন্তু এই আমলে টাকা কে তুলবে তা নির্দিষ্ট না হবার ফলে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে শাসক-ঘনিষ্ঠ একাধিক লোকের কাছ থেকে চাহিদা আসছে এবং তাতেই ব্যবসায়ীদের কাহিল অবস্থা।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যার মধ্যে বিদ্যুৎ সমস্যার জন্য তারা ভারতের বেসরকারি সংস্থার ওপর নির্ভরশীল। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন ওষ্ঠাগত। অনেক সামগ্রী ভারত থেকে না কিনে ঘুরপথে আনতে খরচ বেশি হচ্ছে, ফলে বাজারে তার দামও বেশি হচ্ছে। আবার আমেরিকার চাপে সে দেশ থেকে তুলো আমদানি করতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। যদিও সরকার শুল্কে কিছু ছাড় দিয়েছে।
বাংলাদেশে কট্টর বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের ভোটব্যাঙ্ক ছাড়া যে অনির্দিষ্ট ভোটদাতা আছেন, তাঁরা চাইছেন শেখ হাসিনা বাংলাদেশে এলে এই একতরফা শাসনের অবসান হবে এবং পরিস্থিতির নাকি উন্নতি হবে। বাংলাদেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা দেশে ফিরুন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও যে সেটা খুব একটা চাইবেন তা নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নিত্য ব্যবহার্য পণ্যের মুল্যবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রতিকূলতা এবং বৈদেশিক-কূটনৈতিক চাপ এই সবের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিমধ্যে ভারতে আসবেন কি না বলা মুশকিল। যাঁরা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দিকে নজর রাখেন, তাঁদের একাংশের ধারণা এই বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং ভারতের কী মনোভাব সেটা অবশ্যই বিচার্য। এর মধ্যে আবার রয়েছে বাংলাদেশকে ঘিরে মায়ানমারসহ চিনের ভূমিকা। বাণিজ্যিক কারণে বাংলাদেশের আমদানির প্রায় ৭০ শতাংশেরও বেশি আসে চিন থেকে।

এছাড়া বাংলাদেশের ইতিহাসে হাসিনার আমল থেকেই অল্প অল্প করে বাড়তে থাকা জামাত মধ্যবর্তী ইউনূস সরকারের আমলে তাদের প্রভাব বাড়ায় এবং তারা বর্তমান সরকারের আমলেও সক্রিয়। তাদের প্রতি মার্কিন সরকারের মদতের বিষয়টি এখন বহুলচর্চিত। জামাত নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিরোধী আসনে বসলেও, সরকারের ওপর তাদের চাপ যথেষ্ট। এই বিষয়টা ভারতের কাছে দিনে দিনে যে বেশ চিন্তার হয়ে উঠছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এই অবস্থায় সকলের চোখ আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশের দিকে। কারণ, কার প্রভাবে ঠিক কী হয় সেখানে, তার একটা বড় প্রভাব এই উপমহাদেশের রাজনীতিতে নিসঃন্দেহে পড়বে।