গ্রন্থাগারে বইয়ের তাকে মদের বোতল ও বিপন্ন সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ

নান্টু আচার্য্য

গ্রন্থাগার বা লাইব্রেরি হলো একটি সভ্য সমাজের দর্পণ, সংস্কৃতির ধারক এবং মুক্ত বুদ্ধির চর্চাকেন্দ্র। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার বলেছিলেন, ‘বই পড়ার অভ্যেস মানুষের মনকে পরিশীলিত করে।’ আর সেই পরিশীলিত মনের রসদ জোগায় যে institution বা প্রতিষ্ঠান, তা হলো গ্রন্থাগার। কিন্তু সম্প্রতি দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ডায়মন্ড হারবারের কপাটহাট মোড় সংলগ্ন একটি গ্রন্থাগারের যে দৃশ্য সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে উঠে এসেছে, তা কেবল লজ্জাজনকই নয়, বরং আমাদের সামগ্রিক শিক্ষা ও সামাজিক কাঠামোর চরম দেউলিয়াপনাকেই স্পষ্ট করে দেয়। যে গ্রন্থাগারের আলমারি ও র‍্যাকে সারি সারি জ্ঞানবিজ্ঞানের বই, সাহিত্য, বিজ্ঞান কিংবা ইতিহাসের অমূল্য দলিল সাজানো থাকার কথা ছিল— সেখানে আজ রাজত্ব করছে মদের বোতল আর পেটি। বইয়ের পবিত্র আঙিনাকে গ্রাস করেছে সমাজবিরোধীদের মদের আড্ডাখানা।
এই ঘটনাকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা সস্তা রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির মোড়কে ঢেকে রাখলে আসল সত্যটি আড়ালেই থেকে যাবে। এই দৃশ্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, গ্রামীণ ও মফস্বলীয় স্তরে আমাদের সরকারি বা সরকার-পোষিত সাধারণ গ্রন্থাগারগুলোর অভ্যন্তরীণ অবস্থা কতটা শোচনীয় এবং অরক্ষিত। রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজেদের দায় এড়াতে চাইছে ঠিকই, কিন্তু একজন সাধারণ নাগরিক, বিশেষত একজন শিক্ষানুরাগী বা গ্রন্থাগার পেশাজীবীর দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে এটি মূলত একটি সংস্কৃতির প্রাতিষ্ঠানিক মৃত্যুর শামিল।
প্রশ্ন জাগে, একটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত গ্রন্থাগারে কীভাবে দিনের পর দিন এই ধরণের সমাজবিরোধী কার্যকলাপ চলতে পারল? এর পেছনে প্রথম এবং প্রধান কারণ হলো—গ্রন্থাগার পরিচালনা কমিটির চূড়ান্ত নিষ্ক্রিয়তা, নিয়মিত নজরদারির অভাব এবং পেশাদার কর্মী সংকট। পশ্চিমবঙ্গের বহু গ্রামীণ ও মফস্বল লাইব্রেরিতে আজ লাইব্রেরিয়ান বা কর্মী নেই। বহু জায়গায় লাইব্রেরিগুলো সপ্তাহে ক’দিন খোলে, তার কোনও ইয়ত্তা নেই। যেখানে দিনের আলোতেই লাইব্রেরির দরজা বন্ধ থাকে, সেখানে রাতের অন্ধকারে সমাজবিরোধীদের আখড়া গড়ে ওঠা অস্বাভাবিক কিছু নয়। প্রশাসনের এই উদাসীনতাই পরোক্ষভাবে এই ধরণের অপসংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেয়।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তলিয়ে দেখা দরকার। লাইব্রেরি আন্দোলন এই বাংলার এক গৌরবময় ইতিহাসের অংশ। ঊনবিংশ শতকের নবজাগরণ থেকে শুরু করে বিশ শতকের স্বাধীনতা আন্দোলন— সব জায়গাতেই সাধারণ গ্রন্থাগারগুলো সমাজের চেতনা বদলের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি গড়ে তোলার পেছনে উদ্দেশ্য ছিল একটাই— যাতে প্রান্তিক ও সাধারণ পরিবারের সন্তানরা বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে বিশ্বজ্ঞানের আলো পেতে পারে। আজ যখন আমরা আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে ‘ডিজিটাল লাইব্রেরি’, ‘ইনফরমেশন লিটারেসি’ বা তথ্য সাক্ষরতার কথা বলছি, ঠিক তখনই বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে আমাদের এই ধরনের আদিম ও কদর্য রূপ দেখতে হচ্ছে। শিক্ষার এই অবক্ষয় কোনও আচমকা ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কৃতির প্রতি একধরনের উদাসীনতা এবং মেধার চেয়ে পেশীশক্তি বা সস্তা আমোদ-প্রমোদকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সামাজিক ব্যাধি আজ এই পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। যদি একটি জনপদে লাইব্রেরির চেয়ে মদের দোকানের গুরুত্ব বেড়ে যায়, তবে সেই সমাজের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মেধার চর্চা ছেড়ে অন্ধকারের দিকেই পা বাড়াবে— এতে আশ্চর্যের কিছু নেই।
বর্তমানে ইন্টারনেটের যুগে এমনিতেই যুবসমাজের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস কমছে। স্মার্টফোনের নীল আলোয় বুঁদ হয়ে থাকা প্রজন্মকে যখন লাইব্রেরিমুখী করার জন্য আমাদের বাড়তি উদ্যোগ নেওয়া উচিত, তখন লাইব্রেরির এই কঙ্কালসার চেহারা তাদের আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে। এই ধরণের পরিবেশ দেখে অভিভাবকরাও তাঁদের সন্তানদের লাইব্রেরিতে পাঠাতে ভয় পাবেন। ফলে, যে স্থানটি হওয়ার কথা ছিল মুক্ত চিন্তা ও সুস্থ সামাজিকীকরণের কেন্দ্র, সেটিই আজ হয়ে উঠছে ভয়ের ও বর্জনের কারণ। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার যে স্বপ্ন আমরা দেখি, তা এই আবহে সুদূর পরাহত।
এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির উপায় কী? শুধু ক্ষোভ প্রকাশ বা খবরের কাগজে সম্পাদকীয় লিখে এই পচন রোধ করা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও কঠোর সামাজিক ও প্রশাসনিক আন্দোলন।
প্রথমত, অবিলম্বে ওই নির্দিষ্ট গ্রন্থাগারটিকে এই কলঙ্কমুক্ত করতে হবে। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের উচিত দ্রুত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে সমাজবিরোধীদের সেখান থেকে হঠানো এবং মদের বোতলের বদলে সেখানে পুনরায় বইয়ের তাকগুলো সাজিয়ে তোলা।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি অঞ্চলে লাইব্রেরিগুলোর সুরক্ষায় স্থানীয় পাঠক, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিক ও যুবসমাজকে নিয়ে ‘গ্রন্থাগার বাঁচাও’ কমিটি গঠন করতে হবে। লাইব্রেরি কেবল সরকারি কর্মচারীদের ওপর ছেড়ে দিলেই হবে না, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও সামাজিক নজরদারি না থাকলে এমন ঘটনা বারবার ঘটবে।
তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, রাজ্য সরকারের গ্রন্থাগার দপ্তরকে অবিলম্বে গ্রামীণ ও মহকুমা স্তরের লাইব্রেরিগুলোতে স্থায়ী কর্মী নিয়োগ করতে হবে। শূন্যপদগুলো ফেলে রাখার কারণেই এই অরাজকতা তৈরি হচ্ছে। এর পাশাপাশি লাইব্রেরিগুলোকে আধুনিকীকরণ বা ডিজিটাল নজরদারি ও সিসিটিভির আওতায় এনে এগুলোর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে।
রাজা রামমোহন রায় থেকে শুরু করে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কিংবা পরবর্তীকালে প্রমথ চৌধুরী, সকলেই লাইব্রেরির প্রয়োজনীয়তার কথা বারবার বলে গেছেন। প্রমথ চৌধুরী তাঁর ‘বই পড়া’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘লাইব্রেরি হাসপাতালের চাইতে কম উপকারী নয়, তার কারণ আমাদের শিক্ষার বর্তমান অবস্থায় হাসপাতালের চেয়ে লাইব্রেরির আবশ্যকতা কিছু কম নয়।’
আজ যদি সেই লাইব্রেরিই মদের গুদামে পরিণত হয়, তবে বুঝতে হবে সমাজ মারাত্মকভাবে অসুস্থ এবং তার জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন। সংস্কৃতির এই চরম পতন রুখতে আজ দলমত নির্বিশেষে সমস্ত বিবেকবান মানুষকে সোচ্চার হতে হবে, নইলে আগামী প্রজন্ম আমাদের কোনোদিন ক্ষমা করবে না। আমরা যেন ভুলে না যাই, একটি বইয়ের তাক ভাঙার চেয়েও বিপজ্জনক হলো একটি গ্রন্থাগারের চরিত্র নষ্ট হওয়া। আলোর মন্দিরকে অন্ধকারে ঢেকে দেওয়ার এই চক্রান্ত রুখতেই হবে।