ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া শুধু একটি চাকরি পাওয়ার বিষয় নয়। বিশেষ করে পাঞ্জাবের মতো রাজ্যে সেনাবাহিনীতে যোগদানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারিবারিক ঐতিহ্য, সামাজিক মর্যাদা এবং দেশসেবার এক দীর্ঘ ইতিহাস। বহু পরিবারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম তরুণেরা সেনাবাহিনীতে গিয়েছেন। সেই কারণে অগ্নিপথ প্রকল্পের অধীনে চার বছরের সামরিক পরিষেবা শেষ করে অগ্নিবীরদের একটি বড় অংশ যখন সেনাবাহিনীর বাইরে ফিরে আসছেন, তখন তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক। বিষয়টি শুধু একটি সরকারি প্রকল্পের সাফল্য বা ব্যর্থতার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার তরুণের জীবন, তাঁদের পরিবারের আশা এবং সমাজের ভবিষ্যৎ।
কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিপথ প্রকল্পের প্রথম ব্যাচের প্রায় ৭৫ শতাংশ অগ্নিবীর চলতি বছরের শেষ নাগাদ সশস্ত্র বাহিনী থেকে বেরিয়ে আসবেন। সংখ্যায় তা প্রায় ৩৪,৫০০ জন। তাঁদের মধ্যে এক হাজারেরও বেশি পাঞ্জাবের। চার বছর সেনাবাহিনীতে কাজ করার পরে এই তরুণেরা যখন সাধারণ জীবনে ফিরে আসবেন, তখন তাঁদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে— এর পর কী?
পাঞ্জাব সরকার অগ্নিবীরদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের জন্য যে নীতির কথা ঘোষণা করেছে, তার খসড়ায় পুলিশ কনস্টেবলের ১০ শতাংশ এবং অফিস গার্ডের ২০ শতাংশ পদ তাঁদের জন্য সংরক্ষণের কথা রয়েছে। কিন্তু ঘোষণা আর বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান থেকে গেলে অগ্নিবীরদের অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হল নীতিকে দ্রুত, স্বচ্ছ এবং বাস্তবসম্মতভাবে কার্যকর করা।
এখানে রাজনৈতিক বিতর্কের চেয়ে অগ্নিবীরদের ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। কারণ চার বছর সেনাবাহিনীতে কাটানো একজন তরুণের হাতে শুধু একটি চাকরির অভিজ্ঞতা থাকে না। তাঁর মধ্যে তৈরি হয় শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, দলগত কাজের অভ্যাস, শারীরিক সক্ষমতা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। এই দক্ষতাগুলিকে কাজে লাগানোর মতো সুযোগ
তৈরি করা গেলে অগ্নিবীররা দেশের সম্পদ হয়ে উঠতে পারেন।
পাঞ্জাবে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ কমে যাওয়ার বিষয়টিও তাই গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। একসময় এই রাজ্যের বহু তরুণের কাছে সেনাবাহিনীতে যোগদান ছিল স্বপ্নের মতো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সেই আগ্রহ কমেছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি করা হচ্ছে। চার বছরের পরিষেবা, পেনশনের অনিশ্চয়তা এবং পরিষেবা শেষে কর্মসংস্থানের প্রশ্ন এর একটি কারণ হতে পারে। তবে এর পাশাপাশি পাঞ্জাবের সমাজে পরিবর্তিত জীবনধারাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
আজকের তরুণের সামনে বিদেশে যাওয়ার আকর্ষণ প্রবল। কেউ পড়াশোনার জন্য, কেউ চাকরির জন্য, আবার কেউ দ্রুত আর্থিক সাফল্যের আশায় বিদেশমুখী হচ্ছে। বেসরকারি ক্ষেত্রেও তুলনামূলকভাবে দ্রুত আয়ের সুযোগ অনেককে আকৃষ্ট করছে। ফলে সেনাবাহিনীর কঠোর জীবন, দীর্ঘ প্রশিক্ষণ এবং সীমিত পরিষেবাকাল তরুণদের কাছে আগের মতো আকর্ষণীয় নাও হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাদকাসক্তির সমস্যা এবং শারীরিক সক্ষমতার ঘাটতি। স্কুল-কলেজের পড়াশোনায় অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা, মোবাইল ফোনের ব্যবহার, খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া— সব মিলিয়ে তরুণদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। ফলে সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য যে শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি দরকার, অনেকের মধ্যে তা তৈরি হচ্ছে না। এই সমস্যার সমাধান শুধু নিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে সম্ভব নয়; স্কুল পর্যায় থেকেই খেলাধুলা, শরীরচর্চা
এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পরিবেশ তৈরি
করতে হবে।
আর একটি উদ্বেগজনক বিষয় হল বিদেশে যাওয়ার নামে প্রতারণার শিকার হওয়া। সেনাবাহিনীতে যোগদানের সুযোগ হারিয়ে বা চাকরির অনিশ্চয়তায় হতাশ কিছু তরুণ অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কেউ কেউ রাশিয়ার মতো দেশে পৌঁছে সামরিক কাজে জড়িয়ে পড়েছেন বলেও খবর এসেছে। ‘ডঙ্কি রুট’-এর মতো বিপজ্জনক পথ তরুণদের স্বপ্নকে বিপদের দিকে ঠেলে দেয়। তাই বৈধ বিদেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্পর্কে সরকারি ও সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
অগ্নিবীরদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। চার বছরের সামরিক অভিজ্ঞতাকে যেন জীবনের একটি ‘বিরতি’ হিসেবে দেখা না হয়। বরং সেটিকে পরবর্তী কর্মজীবনের শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করার ব্যবস্থা করতে হবে। পুলিশ, বন দপ্তর, দমকল, কারা বিভাগ, হোম গার্ড, দুর্যোগ মোকাবিলা, নিরাপত্তা পরিষেবা— এমন বহু ক্ষেত্রে অগ্নিবীরদের প্রশিক্ষণ কাজে লাগতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রের মধ্যে সমন্বয় করে
তাঁদের জন্য বিশেষ নিয়োগের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
শুধু চাকরির সংরক্ষণই অবশ্য যথেষ্ট নয়। অগ্নিবীরদের দক্ষতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া দরকার। সেনাবাহিনীতে তাঁরা যে প্রশিক্ষণ পাবেন, তার ভিত্তিতে বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রে সার্টিফিকেশন দেওয়া যেতে পারে। প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ মোকাবিলা, ড্রাইভিং, যোগাযোগ, প্রশাসনিক কাজ এবং বিভিন্ন কারিগরি ক্ষেত্রে তাঁদের পুনঃপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব। কেউ ব্যবসা করতে চাইলে সহজ ঋণ, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শের সুযোগও দেওয়া যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, অগ্নিবীরদের যেন সমাজের চোখে ‘সেনাবাহিনী থেকে ফিরে আসা বেকার যুবক’ হিসেবে দেখা না হয়। তাঁরা দেশের সেবা করেছেন। তাঁদের চার বছরের অভিজ্ঞতা একটি মূল্যবান সম্পদ। রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব সেই অভিজ্ঞতাকে নতুন কর্মজীবনে কাজে লাগানোর সুযোগ করে দেওয়া।
পাঞ্জাবের ক্ষেত্রে বিষয়টির আর একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সেনাবাহিনীর সঙ্গে এই রাজ্যের ঐতিহাসিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তরুণদের মধ্যে সেনাবাহিনীর প্রতি আস্থা ও আগ্রহ বজায় রাখতে হলে তাঁদের সামনে ভবিষ্যতের একটি পরিষ্কার ছবি তুলে ধরতে হবে। চার বছর পরে কী হবে— এই প্রশ্নের উত্তর যত স্পষ্ট হবে, সেনাবাহিনীতে যোগদানের সিদ্ধান্তও তত বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিতে পারবেন তরুণেরা।
অগ্নিপথ প্রকল্প নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে। নীতির মূল্যায়নও সময়ের সঙ্গে হওয়া দরকার। কিন্তু সেই বিতর্কের কেন্দ্রে অগ্নিবীরদের রাখা উচিত নয়। তাঁরা কোনও রাজনৈতিক পক্ষের প্রতীক নন; তাঁরা দেশের তরুণ নাগরিক, যারা সশস্ত্র বাহিনীতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বছর কাটিয়ে নতুন জীবনে প্রবেশ করবেন।
তাই এখন প্রয়োজন কেন্দ্র ও রাজ্য— দুই স্তরের সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ। কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, শিক্ষা, উদ্যোক্তা সহায়তা এবং সামাজিক পুনর্বাসন— সবকিছুকে মিলিয়ে একটি সময়বদ্ধ পরিকল্পনা দরকার। ঘোষিত সংরক্ষণ কার্যকর
করার পাশাপাশি অন্যান্য কর্মক্ষেত্রেও সুযোগ বাড়াতে হবে।
অগ্নিবীরদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা মানে শুধু কয়েক হাজার তরুণকে চাকরি দেওয়া নয়। এর অর্থ হল দেশসেবার মূল্যকে সম্মান করা এবং সেই অভিজ্ঞতাকে দেশের অর্থনীতি ও সমাজের কাজে লাগানো। একজন অগ্নিবীর সেনা ছাড়ার পর যদি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নতুন পেশায় প্রবেশ করতে পারেন, তাহলে তাঁর চার বছরের পরিষেবা বৃথা যায় না। বরং সেই অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে তাঁর জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ের শক্ত ভিত।
অগ্নিবীরের চার বছর, তারপর? নিশ্চিত ভবিষ্যতের অপেক্ষায় হাজার তরুণ
PIC- X
আজ তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত— অগ্নিবীরদের কতজন সেনাবাহিনীতে থেকে গেলেন, তা নয়; বরং সেনাবাহিনী থেকে বেরিয়ে আসা প্রতিটি অগ্নিবীর কতটা মর্যাদা, দক্ষতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে নতুন জীবনে প্রবেশ করতে পারলেন। তাঁদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারলেই অগ্নিবীর প্রকল্পের মানবিক সাফল্যও অনেক বেশি দৃশ্যমান হবে।