নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু শুধু বাংলার নন, তিনি সমগ্র ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক উজ্জ্বলতম নায়ক। তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আত্মত্যাগ, সাহস, দেশপ্রেম এবং স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব ত্যাগের এক অনন্য ইতিহাস। সেই নেতাজিকে নিয়ে সমাজমাধ্যমে কুরুচিকর, অবমাননাকর কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মন্তব্যের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, তাকে স্বাগত জানানো উচিত।
কারণ এটি কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নয়, এটি দেশের এক মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীর মর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন।সাম্প্রতিক সময়ে নেতাজি ও আজাদ হিন্দ ফৌজকে নিয়ে যে ধরনের মন্তব্য সামনে এসেছে, তা নিছক রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইতিহাস নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে।
নেতাজির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, তাঁর কৌশল কিংবা আজাদ হিন্দ ফৌজের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা ও বিতর্কের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। কিন্তু তথ্যভিত্তিক সমালোচনা এবং কুৎসা এক নয়। যুক্তিনির্ভর প্রশ্ন আর ইচ্ছাকৃত অপমানের মধ্যেও স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। সেই সীমারেখা অতিক্রম করলে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে ওঠে।
মুখ্যমন্ত্রীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হল— অভিযুক্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় দেখা হবে না। সাংসদ, বিধায়ক, মন্ত্রী, সরকারি কর্মী কিংবা সাধারণ নাগরিক— যে-ই নেতাজিকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করুন, তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই ঘোষণা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ আইনের শাসনের আসল পরীক্ষা তখনই হয়, যখন একই আইন ক্ষমতাবান এবং সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে সমান ভাবে প্রয়োগ করা হয়।
শুধু মূল পোস্টদাতাকে চিহ্নিত করাই নয়, কে সেই পোস্ট শেয়ার করেছেন, কে মন্তব্য করেছেন, কারা সেটিকে ছড়িয়ে দিয়েছেন— সামাজিক মাধ্যমের সেই ‘ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট’ খতিয়ে দেখার নির্দেশও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বর্তমান সময়ে এই পদক্ষেপ যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক। কারণ সামাজমাধ্যমে কোনও একটি আপত্তিকর বক্তব্য কয়েক মিনিটের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে কোনও ব্যক্তি জেনে-বুঝে এমন বক্তব্য ছড়িয়ে দিলে তার সামাজিক প্রভাবও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশেষত নেতাজির মতো সর্বজনশ্রদ্ধেয় জাতীয় নেতাকে নিয়ে পরিকল্পিত ভাবে মিথ্যা তথ্য বা অবমাননাকর প্রচার চালানো হলে তার প্রভাব শুধু একটি রাজনৈতিক দলের উপর পড়ে না। তা দেশের ইতিহাস, স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি এবং জাতীয় চেতনাকেও আঘাত করতে পারে। তাই এই ধরনের প্রবণতার বিরুদ্ধে শুরুতেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
নেতাজির মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে সরকারের আর একটি উদ্যোগও প্রশংসনীয়। সরকারি স্কুল এবং দপ্তরে নেতাজির ছবি বাধ্যতামূলক করার প্রক্রিয়া শুরু করার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিতে নেতাজির ছবি থাকা নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়। নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করানোর ক্ষেত্রে এর একটি প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে। তবে ছবির পাশাপাশি নেতাজির জীবন ও আদর্শ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের জানানো আরও জরুরি।
নেতাজির সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর অদম্য দেশপ্রেম। তিনি এমন এক সময়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ছিল প্রায় অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জ। তাঁর আজাদ হিন্দ ফৌজ ভারতীয়দের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল। তাঁর ইতিহাস তাই কোনও দলীয় সম্পত্তি নয়। যে কোনও রাজনৈতিক দল তাঁকে নিজেদের মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, কিন্তু তাঁকে কেবল একটি দলের নেতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আজ সমাজমাধ্যমের যুগে ইতিহাসের বিকৃতি অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকটি শব্দ, একটি ছবি কিংবা একটি ছোট ভিডিও কখনও কখনও এমন বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে, যার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়। তাই প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে। কোনও পোস্ট দেখলেই তা বিশ্বাস বা প্রচার না করে তথ্য যাচাই করা দরকার।
নেতাজির প্রতি শ্রদ্ধা মানে শুধু তাঁর জন্মদিনে মাল্যদান নয়। তাঁর নাম উচ্চারণ করে রাজনৈতিক বক্তৃতা দেওয়াও যথেষ্ট নয়। তাঁর আদর্শ, আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার স্বপ্নকে সম্মান করা প্রয়োজন। সেই সম্মানের একটি দিক হল তাঁর সম্পর্কে মিথ্যা ও কুরুচিকর প্রচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।
এই জায়গাতেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কঠোর বার্তার গুরুত্ব। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, ইতিহাস নিয়ে বিতর্কও চলবে। কিন্তু নেতাজির মতো জাতীয় বীরের অবমাননাকে স্বাভাবিক করে তোলা কোনও সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।
তাই নেতাজিকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের বিরুদ্ধে কঠোর এবং নিরপেক্ষ আইনি ব্যবস্থা শুধু স্বাগত নয়, তা সমাজেরও দাবি। তবে সেই কঠোরতা হতে হবে আইনের সীমার মধ্যে, প্রমাণের ভিত্তিতে এবং সকলের ক্ষেত্রে সমান। তাহলেই নেতাজির মর্যাদা রক্ষার এই উদ্যোগ সত্যিকার অর্থে অর্থবহ হয়ে উঠবে।