অস্থির পৃথিবী ও ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্ন

উজ্জ্বলকুমার দত্ত

পশ্চিম এশিয়ার আকাশে যখনই যুদ্ধের অশনি-মেঘমালা ঘনীভূত হয়, তখন তার ছায়া কেবল সেই অঞ্চলের সীমারেখায় আবদ্ধ থাকে না। আধুনিক বিশ্বের অর্থনীতি এতটাই আন্তঃনির্ভরশীল যে, কোনও একটি অঞ্চলের সংঘাত মুহূর্তের মধ্যেই সমগ্র পৃথিবীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে দাবানলের মত আলোড়ন তোলে। আজ পশ্চিম এশিয়ায় যখন ভূ–রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা আবার বাড়ছে, তখন তার প্রভাব বিশ্ব জ্বালানি বাজারে স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচা তেলের মূল্য অস্থির হয়ে উঠছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ফলে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলির সামনে নতুন আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

ভারত সেই দেশগুলির অন্যতম, যার অর্থনীতি এখনও অনেকাংশে আমদানিকৃত তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। দেশের শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন—সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানি। তাই পশ্চিম এশিয়ায় কোনও সামরিক সংঘাত দেখা দিলে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে পারে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর। এই পরিস্থিতিতে কেবল জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখাই যথেষ্ট নয়; বাজারে স্থিতিশীলতা রক্ষা করা এবং অযাচিত আতঙ্ক বা গুজবের বিস্তার রোধ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।


পশ্চিম এশিয়া বহু দশক ধরে বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী অঞ্চল। উপসাগরীয় অঞ্চলের বিশাল তেল ও গ্যাস ভাণ্ডার দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব অর্থনীতির গতিকে সচল রেখেছে। এখান থেকে প্রতিদিন অসংখ্য তৈলবাহী জাহাজ গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ অতিক্রম করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছয়। কিন্তু যখনই এই অঞ্চলে সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দেয়, তখন সেই সমুদ্রপথগুলির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। যদি যুদ্ধের কারণে এসব পথে বাধা সৃষ্টি হয়, তাহলে তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে। পাশাপাশি জাহাজের নিরাপত্তা ব্যয়, বিমা খরচ এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপর।

ভারতের জ্বালানি কাঠামোর দিকে তাকালে বোঝা যায় যে, এই পরিস্থিতি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ। দেশ তার মোট তেলের চাহিদার প্রায় আশি শতাংশেরও বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করে। এর একটি বড় অংশ আসে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি থেকে। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লেই ভারতের জ্বালানি বাজারে উদ্বেগের সুর শোনা যায়। যদি যুদ্ধের কারণে তেলের সরবরাহ কমে যায় বা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম হঠাৎ বেড়ে যায়, তবে তার প্রভাব সরাসরি ভারতের অর্থনীতিতে পড়বে।

তেলের দামের বৃদ্ধি শুধু পেট্রোল বা ডিজেলের দামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে গোটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়। পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে এবং বাজারে বিভিন্ন দ্রব্যের দামও বৃদ্ধি পায়। কৃষিক্ষেত্রও এর বাইরে নয়, কারণ কৃষিকাজের অনেক যন্ত্রপাতি ও পরিবহন ব্যবস্থা পেট্রোলিয়াম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রতিফলন দেখা যায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ পড়ে।

প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রেও ভারতের পরিস্থিতি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দেশের বহু সার কারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ভারতের গ্যাসের চাহিদার একটি বড় অংশও বিদেশ থেকে আমদানি করা হয় এবং তার উল্লেখযোগ্য অংশ আসে পশ্চিম এশিয়া থেকে। যদি সংঘাতের কারণে গ্যাস সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটে, তবে তার প্রভাব পড়তে পারে সার উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর। এর ফলে কৃষি ও শিল্প— উভয় ক্ষেত্রেই নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

জ্বালানি সংকট কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জও। জ্বালানি সম্পদের ঘাটতি বা অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি যে কোনও দেশের উন্নয়নের গতিকে ধীর করে দিতে পারে। দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলা ভারতের জন্য জ্বালানির ধারাবাহিক সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকে, তবে দেশের আমদানি ব্যয় বাড়বে। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পাবে এবং মুদ্রা বিনিময় হারেও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে ভারতের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। সরকারকে বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করতে হবে যাতে জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। প্রথমত, তেল ও গ্যাস আমদানির উৎসকে বৈচিত্র্যময় করা জরুরি। কোনও একটি অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই গত কয়েক বছরে ভারত রাশিয়া, আমেরিকা, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলির সঙ্গে জ্বালানি আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

এর পাশাপাশি কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুতও জ্বালানি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। জরুরি পরিস্থিতির জন্য ভারত ইতিমধ্যেই কিছু কৌশলগত তৈলভাণ্ডার তৈরি করেছে। এগুলির উদ্দেশ্য হলো— হঠাৎ সরবরাহ ব্যাহত হলে কিছু সময়ের জন্য দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটানো।

তবে কেবল মজুত তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য এবং বিকল্প শক্তির উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সমাজে ছড়িয়ে পড়া গুজব বা আতঙ্কও একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেক সময় সামাজিক মাধ্যমে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে যে দেশে জ্বালানির ঘাটতি তৈরি হতে চলেছে। ফলে মানুষ আতঙ্কে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জ্বালানি মজুত করতে শুরু করে, যা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারে। তাই সরকার ও প্রশাসনের দায়িত্ব হলো সময়মতো সঠিক তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট ভারতকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়— জ্বালানি ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার দিকে আরও এগিয়ে যাওয়া জরুরি। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং জৈবশক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে। গত কয়েক বছরে ভারত এই ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে।

পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয় যে, বিশ্বরাজনীতি এবং জ্বালানি অর্থনীতি গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। কোনো একটি অঞ্চলের সংঘাত পুরো বিশ্বের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। ভারতের জন্য তাই এই সময়টি সতর্কতা, সংযম এবং দূরদৃষ্টির সঙ্গে নীতি নির্ধারণের সময়।

ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে আমরা বারবার একটি সত্যই উপলব্ধি করতে পারি যে— সংকট কেবল বিপদের দূত হয়ে আসে না; অনেক সময় তা ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে নির্মাণের সম্ভাবনাও উন্মোচিত করে। প্রতিটি বড় অস্থিরতার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে আত্মসমালোচনার সুযোগ, নীতিকে পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান এবং আগামীর পথকে আরও সুদৃঢ় করে তোলার সম্ভাবনা।

এই মুহূর্তে ভারতের সামনেও তেমনই এক সময় উপস্থিত হয়েছে। যদি আমাদের দেশ বিচক্ষণতা, সংযম এবং সুদূরপ্রসারী নীতির সহায়তায় পরিস্থিতিকে বিচার করতে পারে, তবে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের অভিঘাত সামাল দেওয়াই কেবল তার একমাত্র সাফল্য হবে না। বরং এই অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে ভবিষ্যতের জন্য আরও দৃঢ়, সুষম ও নিরাপদ জ্বালানি কাঠামো নির্মাণের পথও সুস্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

অতএব সংকটকে কেবল ভয়ের চোখে দেখার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন তাকে উপলক্ষ করে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পরিকল্পনার মাধ্যমে আগামী দিনের ভিত্তিকে আরও শক্ত করে তোলা। ইতিহাসের শিক্ষাই আমাদের এই কথাই মনে করিয়ে দেয়।