মা দুর্গার হাতের ছাপ— নীতা আম্বানির গয়নায় হারানো ভারত

Photo: ANI

যে কেউ ভিডিও বা ছবিটা প্রথম দেখলে হয়তো চোখ আটকে যাবে গয়নার ঝলকে। সোনার শরীর, মুক্তোর মৃদু আলো, রঙিন পাথরের দীপ্তি— সব মিলিয়ে এমন এক অলংকার, যার দিকে তাকালে প্রথমেই মনে হবে, এ যেন কোনো রাজপ্রাসাদের পুরনো সিন্দুক খুলে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু ছবিটার দিকে আর একটুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে কেমন যেন অন্য একটি গল্প শুরু হয়। মনে হয়, গলার কাছে ঝুলছে শুধু একটি নেকলেস নয়, ঝুলছে একটি দেশ। আরও ভালো করে দেখলে মনে হয়, সেই দেশের গায়ে সময়ের অসংখ্য আঁচড়। নেকলেসটির নাম ‘আম্রপালী ভারতম’। নামটিও কম আশ্চর্যের নয়। ‘ভারতম’ শব্দটির মধ্যে যেন একটি ভূখণ্ডের দীর্ঘ স্মৃতি এসে বসে আছে। আর সেই স্মৃতিকে শরীরে ধারণ করেছেন নীতা আম্বানি। এখান থেকেই গয়নার গল্পটি একটু অন্য দিকে মোড় নেয়।

ধরা যাক, একটি পুরনো গ্রামের বাড়ি। অন্ধকার ঘরের এক কোণে কাঠের বাক্স। বাক্স খুললে বেরিয়ে এল বহু পুরনো একটি হার। হয়তো তার মালিকের নাম কেউ জানে না। কোথাও কোনও কানের দুল পড়ে আছে, কোথাও ভাঙা একটি নথ, কোথাও চাঁদের মতো বাঁকানো কোনও অলংকারের অংশ। কোনোটি হয়তো একসময় কোনও পরিবারের বউয়ের গলায় উঠেছিল, কোনোটি মন্দিরের উৎসব দেখেছিল, কোনোটি আবার কোনও অচেনা কারিগরের হাতে তৈরি হয়ে বহু বছর ধরে একটি ঘরের অন্দরমহলে ঘুমিয়ে ছিল। তারপর একদিন সেই টুকরোগুলি একে একে বেরিয়ে এল। একটি হার এল কেরল থেকে। একটি নকশা এল দক্ষিণ ভারতের অন্য কোনো প্রান্ত থেকে। এল নথ, চাঁদবালি, ঝুমর, বিল্লা, কানের দুলের অংশ। সঙ্গে যোগ হল মুক্তো, রঙিন রত্ন। বিচ্ছিন্ন সেই স্মৃতিগুলিকে পাশাপাশি বসানো হল। তারপর শুরু হল অপেক্ষা।

এক বছর। দুই বছর। বা তিন বছর। হ্যাঁ, প্রায় তিন বছরের শ্রমের পরে তৈরি হল ‘আম্রপালী ভারতম’। একটি নেকলেস। কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ হয় না। বরং এখান থেকেই শুরু। কারণ একটি পুরনো গয়না কখনও শুধু গয়না নয়। তার মধ্যে মানুষের জীবন লুকিয়ে থাকে। যে হাতটি সোনা গলিয়েছিল, যে আঙুলটি নকশার সূক্ষ্ম রেখা এঁকেছিল, যে চোখটি রাতের পর রাত ক্ষুদ্র পাথর বসিয়েছিল— সেই মানুষটির নাম হয়তো ইতিহাসের কোনও বইয়ে নেই। রাজা-মহারাজাদের নাম আমরা মনে রাখি, গয়নার মালিকের নাম মনে রাখি, কিন্তু যে কারিগর নিজের চোখের আলো কমিয়ে একটি নকশাকে নিখুঁত করেছিলেন, তাঁর নাম অনেক সময় হারিয়ে যায়। ইতিহাসের এই জায়গাটিই সবচেয়ে অদ্ভুত। যে মানুষ ইতিহাস তৈরি করেন, ইতিহাস অনেক সময় তাঁর নামটিই ভুলে যায়।


ভারতের অলংকারশিল্পের ইতিহাসেও এমন কত নাম হারিয়ে গেছে কে জানে! রাজদরবার ছিল, নবাবের দরবার ছিল, জমিদারবাড়ি ছিল। শিল্পীর কাজের মূল্য ছিল। পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। একটি নকশা তৈরি হলে তার কদর ছিল। একটি পরিবারের বহু প্রজন্ম একই কারিগরি শিখে জীবন কাটাত। তারপর সময় বদলাল। রাজা গেলেন, রাজদরবার গেল। বদলে গেল বাজার। যন্ত্র এল। দ্রুত উৎপাদন এল। একই নকশা হাজারবার তৈরি হওয়ার ব্যবস্থা হল। সস্তা অনুকরণ বাজার দখল করল। আর সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেলেন সেইসব কারিগর, যাঁদের হাতে ছিল ধীর, নিখুঁত, ধৈর্যের শিল্প। কারও ছেলে আর বাবার কাজ শিখল না। কেউ চলে গেল অন্য পেশায়।

কেউ হয়তো নিজের দোকান বন্ধ করে দিলেন। আর কোনও এক পুরনো বাক্সের ভিতর পড়ে রইল একটি নকশা। ‘আম্রপালী ভারতম’-এর গল্প তাই আমাদের আনন্দ দেয়, আবার একটু অস্বস্তিতেও ফেলে। আনন্দ এই কারণে যে, হারিয়ে যেতে বসা অলংকাররীতির কিছু অংশ আবার মানুষের চোখের সামনে এসেছে। এমন একটি গয়না তৈরি হয়েছে, যা ঐতিহ্যকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
অস্বস্তি অন্য জায়গায়। যে কারিগরের হাত থেকে এই ঐতিহ্য এসেছে, তাঁর জীবনে সেই আলো কতটা পৌঁছেছে? একটি গয়না কোটি টাকার হতে পারে। কিন্তু যে হাত সেটি তৈরি করেছে, সেই হাতের মূল্য কি তার সঙ্গে বেড়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু একটি নেকলেস দিতে পারবে না। উত্তর দিতে হবে সমাজকে, বাজারকে, শিল্পপতিকে, রাষ্ট্রকে। কারণ ঐতিহ্য সংরক্ষণ মানে পুরনো নকশাকে নতুন গয়নায় বসিয়ে দেওয়া নয়। ঐতিহ্য সংরক্ষণ মানে সেই মানুষটিকে বাঁচিয়ে রাখা, যিনি নকশাটির ভাষা জানেন।

একজন বৃদ্ধ স্বর্ণকারের কথা ভাবুন। তাঁর হাত কাঁপে। চোখে আগের মতো দৃষ্টি নেই। কিন্তু একটি পুরনো নকশা সামনে রাখলে তিনি হয়তো এক মুহূর্তে বলে দিতে পারেন— এই রেখাটি কোথা থেকে এসেছে, এই বাঁকটির নাম কী, কোন অঞ্চলের কারিগররা এভাবে কাজ করতেন। সেই জ্ঞান কোথায় লেখা আছে? কোথাও নয়। তাঁর সঙ্গে তিনি চলে গেলে ইতিহাসের একটি দরজাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই ‘আম্রপালী ভারতম’-এর দিকে তাকিয়ে শুধু নীতা আম্বানির গলার গয়না দেখলে গল্পের অর্ধেকই দেখা হবে। বাকি অর্ধেক দেখতে হলে চোখ নামাতে হবে। গয়নার ঝলক পেরিয়ে যেতে হবে কারিগরের হাতের কাছে। যেতে হবে দক্ষিণ ভারতের সেইসব জনপদে, যেখানে কোনও একসময় একটি নকশা শুধু অলংকার ছিল না, ছিল ঘরের সংস্কৃতি, উৎসবের স্মৃতি, পারিবারিক পরিচয়।

এখানেই বিত্তেরও একটি দায় তৈরি হয়। বিত্ত দিয়ে অনেক কিছু কেনা যায়। কিন্তু যদি সেই বিত্ত দিয়ে হারিয়ে যাওয়া একটি শিল্পরীতি আবার শেখানো যায়, তরুণ কারিগর তৈরি করা যায়, পুরনো নকশা নথিবদ্ধ করা যায়, শিল্পীদের ন্যায্য পারিশ্রমিক দেওয়া যায়, তবে সেই অর্থের একটি অংশ ইতিহাসের কাছে ফিরে যায়। অন্যথায় গয়নাটি কেবল গয়নাই থেকে যায়। আয়নার সামনে ঝলমলে। ছবিতে সুন্দর। কিন্তু কারিগরের ঘরে অন্ধকার। ‘আম্রপালী ভারতম’ তাই শেষ পর্যন্ত একটি নেকলেসের গল্প নয়। এটি একটি প্রশ্নের গল্প। আমাদের কাছে প্রশ্ন রাখে— আমরা কি ঐতিহ্যকে শুধু পরতে চাই, না তাকে বাঁচাতেও চাই?

ছবিতে নীতা আম্বানির গলায় যে গয়নাটি দেখা যায়, তার মধ্যে হয়তো ভারতের বহু অঞ্চলের বিচ্ছিন্ন স্মৃতি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। কোনোটি কেরলের, কোনোটি দক্ষিণ ভারতের অন্য প্রান্তের, কোনোটি হয়তো এমন এক কারিগরের হাতের, যার নাম আমরা কোনোদিন জানতে পারব না। সেই অচেনা কারিগরের হাতটিকেই শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হয়। কারণ সোনা ইতিহাস নয়। রত্নও ইতিহাস নয়। ইতিহাস তৈরি হয় মানুষের হাতে। আর কখনও কখনও সেই ইতিহাসই নিঃশব্দে এসে ঝুলে থাকে একজন মানুষের গলার কাছে— একটি নেকলেস হয়ে। তখন তাকে শুধু গয়না বলে ডাকতে ইচ্ছে করে না। মনে হয়, গলার কাছে ঝুলছে ভারত। তার ঝলমলে মুখের আড়ালে, খুব নীরবে, একজন অচেনা কারিগর এখনও হাতুড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন।