কেরলের নতুন অধ্যায়

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

কেরলের রাজনীতিতে কংগ্রেসের নতুন অধ্যায় শুরু হল ভি ডি সতীশনের নেতৃত্বে। দীর্ঘ ১১ দিনের অপেক্ষার পর কংগ্রেস হাইকম্যান্ড অবশেষে তাঁকেই বিধানসভা দলের নেতা হিসেবে বেছে নিয়েছে। এই বিলম্বিত সিদ্ধান্ত যেমন প্রশ্ন তুলেছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কার্যকারিতা নিয়ে, তেমনই সামনে এনে দিয়েছে সতীশনকে দেওয়া বড় দায়িত্বের ছবিটিও।

সাম্প্রতিক নির্বাচনে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ) কেরলে এক অভূতপূর্ব জয় পেয়েছে। ১৪০টির মধ্যে ১০২টি আসন জিতে তারা বামফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। এই জয় শুধু একটি রাজনৈতিক পালাবদল নয়, বরং একপ্রকার প্রত্যাবর্তন— কারণ ২০২১ সালে পরপর পরাজয়ের ধাক্কায় ইউডিএফ কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সেই অবস্থান থেকে উঠে এসে এমন জয় অর্জন করা নিঃসন্দেহে একটি বড় সাফল্য।

এই সাফল্যের পিছনে ভি ডি সতীশনের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিরোধী দলনেতা হিসেবে তিনি ‘টিম ইউডিএফ’ ধারণা সামনে এনে দল এবং জোটের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিলেন। কর্মীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনাই ছিল তাঁর প্রথম সাফল্য। এরপর উপনির্বাচন এবং লোকসভা নির্বাচনে ধারাবাহিক ভালো ফলাফল ইউডিএফকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।


তবে শুধু ইউডিএফের কৌশলই নয়, বামফ্রন্টের কিছু রাজনৈতিক ভুলও এই জয়ের পথ সহজ করেছে। বিশেষ করে, হিন্দু ভোটব্যাঙ্কে ভাঙন এবং কিছু বিতর্কিত অবস্থান তাদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নায়ার এবং এঝাভা সম্প্রদায়ের সংগঠনগুলিকে খুশি করার চেষ্টা এবং সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে কিছু নেতার মন্তব্যে নীরবতা— এই সবই বামেদের জন্য উল্টো ফল দিয়েছে। সতীশন খুব দক্ষতার সঙ্গে এই দুর্বলতাগুলিকে সামনে এনে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে লড়াইকে জোরদার করেন।

কিন্তু এখনই তাঁর আসল পরীক্ষা শুরু। সরকার গঠন এবং পরিচালনা— এই দুই ক্ষেত্রেই তাঁকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। প্রথমত, দলের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ। কংগ্রেসের দুই অভিজ্ঞ নেতা কে সি বেণুগোপাল এবং রমেশ চেন্নিথলা ইতিমধ্যেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এই পরিস্থিতিতে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সামলানো সহজ কাজ নয়।

দ্বিতীয়ত, মন্ত্রিসভা গঠন। বিভিন্ন গোষ্ঠী, অঞ্চল এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে একটি গ্রহণযোগ্য মন্ত্রিসভা তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে সামান্য ভুলও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি। নির্বাচনের আগে ইউডিএফ যে ‘পাঁচটি গ্যারান্টি’র প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা বাস্তবায়িত করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। কেরলের আর্থিক অবস্থা এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন আয়ের উৎস খুঁজে বের করা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি হবে।
এর পাশাপাশি রয়েছে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চাপ। কিছু গোষ্ঠী ইতিমধ্যেই সতীশনকে নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করছে। কিন্তু কেরলের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ঐতিহ্যগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ। এই ভারসাম্য বজায় রাখা এবং সব সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জন করা তাঁর অন্যতম বড় দায়িত্ব হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ভি ডি সতীশনের সামনে সুযোগ যেমন বড়, চ্যালেঞ্জও ততটাই কঠিন। বিরোধী নেতা হিসেবে তিনি যে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, তা এখন শাসক হিসেবে প্রমাণ করতে হবে। রাজনৈতিক কৌশল, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দলীয় ঐক্য— এই তিনের সমন্বয়েই তাঁর সাফল্য নির্ভর করবে।

কেরলের মানুষ তাঁকে একটি বড় ম্যান্ডেট দিয়েছে। এখন দেখার, সেই আস্থার মর্যাদা তিনি কতটা রাখতে পারেন। আগামী দিনগুলোই নির্ধারণ করবে, এই নতুন নেতৃত্ব কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটিয়েছে, নাকি সত্যিই এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে পেরেছে।