উন্নয়নের যূপকাষ্ঠে ধ্বংসের নিপুণ আয়োজন

পুলক মিত্র

বিতর্কের কেন্দ্রে আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। কেন্দ্রীয় সরকার এই দ্বীপপুঞ্জকে ‘ভারতের হংকং’ বানাতে চায়। প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে ‘গ্রেট নিকোবর আইল্যান্ড ডেভলপমেন্ট প্রজেক্ট’। নীতি আয়োগের অধীনে প্রকল্পের কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রকল্পের জন্য আনুমানিক খরচ ধরা ১০০০ কোটি মার্কিন ডলার৷

কী কী রয়েছে এই প্রকল্পে? দ্বীপপুঞ্জে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ২৪৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তৈরি হবে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, আন্তর্জাতিক মানের একটি ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর, একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, প্রায় সম্পূর্ণ নতুন একটি শহর ও ট্যুরিজম হাব। এক কথায়, প্রকল্পটির কাজ শেষ হলে, ভোল বদলে যাবে গোটা আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের।


একাধিক কারণে এই প্রকল্পটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। প্রথমত, গ্রেট নিকোবর দ্বীপের অবস্থান মালাক্কা প্রণালী থেকে মাত্র ৪০ নটিকাল মাইল দূরে। জলপথে গোটা বিশ্বের বাণিজ্যের এক-তৃতীয়াংশই হয়ে থাকে এই পথ দিয়ে। তাই কর্পোরেট মালিকদের কাছে গ্রেট নিকোবর দ্বীপে কন্টেইনার বন্দরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এছাড়া, ভারত মহাসাগরে চিনের একাধিপত্য বৃদ্ধি নিয়ে স্বস্তিতে নেই দিল্লি। তাই কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশ্য হল, এই প্রকল্পের মাধ্যমে চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে খর্ব করা।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, খুবই ভালো উদ্যোগ। উন্নয়নের এই কর্মযজ্ঞে আপত্তির কী আছে? কিন্তু এই উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যেই ধ্বংসের কালো মেঘ দেখছেন পরিবেশবিদ, নৃতত্ত্ববিদ, ভূতাত্ত্বিকরা। তাঁদের দাবি, বন্ধ হোক এই প্রকল্প। পরিবেশবিদ ও ভূ-বিজ্ঞানীদের মতে, এই প্রকল্পের একটা বড় অংশই ক্রান্তীয় বৃষ্টি অরণ্যের অন্তর্ভুক্ত। সরকারি তথ্য বলছে, প্রকল্পের ফলে কাটা পড়বে প্রায় ১০ লক্ষ গাছ। অন্যদিকে, পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১০ লক্ষ নয়, সংখ্যাটা প্রায় ১ কোটিতে পৌঁছবে।

তাঁদের মতে, ‘প্রকল্প এলাকাটি গ্রেট নিকোবর বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের অধীন সংরক্ষিত বনের অংশ এবং সেটি ইউনেস্কো-স্বীকৃত একটি অঞ্চল ও দ্বীপটির ৮৫% এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এলাকাটি স্থানীয় প্রজাতির প্রায় ২৪ শতাংশের জন্য অভয়ারণ্য হিসেবে কাজ করে। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ক্রান্তীয় বৃষ্টি অরণ্য থেকে প্রায় ১০ লক্ষ গাছ কেটে ফেললে, ধ্বংস হয়ে যাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্র, যা আঞ্চলিক মৌসুমী বৃষ্টিচক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। বিকল্প হিসেবে, হরিয়ানা এবং মধ্যপ্রদেশে বনাঞ্চল গড়ে তোলার প্রস্তাব বৈজ্ঞানিক দিক থেকে অর্থহীন। কারণ এই এলাকা কখনই গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অনন্য বাস্তুতন্ত্রের বিকল্প হতে পারে পারে না।’

এই দ্বীপের বনাঞ্চলে প্রায় ৬৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে, যা শুধুমাত্র এই অঞ্চলেই পাওয়া যায়। সেইসঙ্গে রয়েছে ১১ প্রজাতির স্থানীয় স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৩২ প্রজাতির স্থানীয় পাখি এবং ৭ প্রজাতির স্থানীয় সরীসৃপ, যাদের একমাত্র বাসভূমি হল এই দ্বীপ। ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্টটি যে গ্যালাথিয়া উপসাগরে তৈরি হতে চলেছে, সেটি হল, বিশ্বের বিপন্ন লেদারব্যাক কচ্ছপ প্রজাতির প্রজনন স্থল। তাই গ্রেট নিকোবর দ্বীপে উন্নয়নের বলি হবে এই সমস্ত প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীকে। পৃথিবীর বুক থেকে এরা চিরতরে হারিয়ে যাবে। তাছাড়া, গ্যালাথিয়া উপসাগরে প্রস্তাবিত বন্দরটি বিস্তীর্ণ প্রবাল প্রাচীর এবং সামুদ্রিক আবাসস্থলকে ধ্বংস করবে।

এছাড়া, গ্রেট নিকোবর দ্বীপটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূকম্পীয় চ্যুতিরেখার ওপর অবস্থান করছে। গ্রেট নিকোবর থেকে প্রায় ৮০ মাইল দূরে উদ্ভূত ভূমিকম্পের ফলেই ২০০৪ সালের ভয়াবহ সুনামি ঘটেছিলো৷ সুনামি আঘাত হানার দিন গ্রেট নিকোবরের দক্ষিণ প্রান্ত প্রায় ১৫ ফুট বসে যায় এবং ওই অংশটি সমুদ্রে তলিয়ে যায়। সুনামির তাণ্ডবে উপকূলের বেশিরভাগ বসতি এলাকাই ভেসে গিয়েছিল। এই ভূমিকম্পীয় চ্যুতিরেখাটি এখনও সক্রিয় রয়েছে। গত বছরের জুলাই মাসে এক ভূ-বিজ্ঞানী সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কাছে ছোট ছোট ভূমিকম্পের একটি চলমান ধারা আন্দামান সাগরে একটি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ইঙ্গিত বহন করতে পারে, যা আরেকটি সুনামির আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে।

গ্রেট নিকোবর দ্বীপটি গ্রেট নিকোবরিজ্ ও শম্পেন উপজাতি (Shompen Tribe) সম্প্রদায়ের বসতিস্থল। শম্পেন আদিবাসী সম্প্রদায়ের ইতিহাস ১০ হাজার বছরের পুরনো এবং এই জনগোষ্ঠীকে বিশেষভাবে বিপন্ন আদিবাসী গোষ্ঠী (পিভিটিজি) হিসেবে চিহ্নিত করেছে ভারত সরকার। বর্তমানে এদের জনসংখ্যা মাত্র ২০০ থেকে ৪০০-র মধ্যে। এই শম্পেনরা এখনও পশু শিকার, ফল-মূল আহরণ এবং একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ের কৃষিকাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে।

নিকোবরের জনগোষ্ঠীর প্রধান জীবিকা হল কৃষিকাজ। আন্দামান ও নিকোবর আদিবাসী উপজাতি সুরক্ষা আইন, ১৯৫৬-এর অধীনে ৯০০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই দ্বীপটির তিন-চতুর্থাংশের বেশি এলাকা উপজাতি সংরক্ষিত এলাকা হিসাবে চিহ্নিত। ভারতীয় আইন অনুযায়ী, প্রকল্পটির পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে সরকার যে ডিপিআর বা বিস্তারিত প্রকল্প রিপোর্ট তৈরি করেছে, তাতে যথেষ্ট গলদ রয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পের ফলে শম্পেন উপজাতির কোনও ক্ষতি হবে না। শম্পেনদের নিজেদের বাসভূমিতে ঘেরাটোপে আবদ্ধ করার জন্য ওই রিপোর্টে ‘জিও ফেন্সিং’-এর সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রকল্পটির পরিকল্পনাকারীরা জানিয়েছেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে সাড়ে তিন লক্ষ মানুষকে এই দ্বীপে বসবাসের জন্য নিয়ে আসা হবে, এর ফলে এই দ্বীপের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে প্রায় ৪০ গুণ। ইতিহাস বলছে, উনিশ শতকের শেষের দিকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের সংস্পর্শে আসার কারণে নিকোবরের উত্তরে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের ‘গ্রেট আন্দামানিজ’ নামে পরিচিত আটটি আদিবাসী গোষ্ঠীর বিলুপ্তি ঘটেছিল। বহিরাগত রোগজীবাণু থেকে প্রতিরোধ ক্ষমতাহীন, হাজার হাজার বছর ধরে প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নভাবে বসবাসরত আদিবাসী উপজাতিদের কাছে বাইরে থেকে আসা লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁদের বিলুপ্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

ভারতীয় সরকারের ২০২২ সালের নিজস্ব পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘প্রাকৃতিক পরিবেশে যে কোনও ধরনের ব্যাঘাত বা পরিবর্তন… যেখানে তারা (শম্পেনরা) বাস করে, তা তাদের অস্তিত্বের জন্য গুরুতর সঙ্কট ডেকে আনতে পারে।’ এই প্রসঙ্গে অ্যানথ্রপলজিকাল সার্ভে অফ্ ইন্ডিয়ার প্রাক্তন ডিরেক্টর ত্রিলোকনাথ পন্ডিত বলেছেন, ‘এই ধরনের বড় পরিকাঠামোগত প্রকল্প সঠিক নয়… শম্পেনরা সংখ্যায় কম হতে পারে, কিন্তু তাদের দ্বীপের বনভূমি সম্পর্কে অসাধারণ জ্ঞান রয়েছে। তারা যেমন আছে, তেমনই থাকতে দিন। যদি আমরা যদি তাদের বসতিস্থলে প্রবেশ করি, তাহলে রোগব্যাধির কারণে তাদের বিলুপ্তি দ্রুততর হবে।’

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে, ১৩টি দেশের ৩৯ জন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে এক চিঠিতে এই প্রকল্পটিকে ‘শম্পেনদের জন্য মৃত্যুদণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তারা অবিলম্বে এই প্রকল্পটি বাতিল করার দাবি জানান। একইভাবে, ২০২৪ সালের এপ্রিলে ১২ জন প্রথম সারির ভারতীয় নৃতত্ত্ববিদ এবং বিশেষজ্ঞ এক খোলা চিঠি লিখে প্রকল্পটি বাতিল করার দাবি জানান।

এই বন্দর তৈরির কাজে যে কর্পোরেট সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই আগ্রহ প্রকাশ করেছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম হল আদানি পোর্ট। কেন্দ্রীয় সরকার প্রকৃতিকে ধ্বংস করার একের পর এক প্রকল্প গ্রহণ করেই চলেছে। এর সর্বশেষ দৃষ্টান্ত হল, আরাবল্লী পর্বতের প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস। লাক্ষাদ্বীপে ট্যুরিজম হাব, হিমালয়ের জলভান্ডার লাদাখে গ্রিন এনার্জি ও ট্যুরিজম হাব, উত্তরাখণ্ড ও হিমাচল প্রদেশে পাহাড় কেটে চারধাম টানেল – এরকম আরও অজস্র দৃষ্টান্ত রয়েছে। এর পরিণতি হিসেবে বন্যা, খরা, ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঘটনা বেড়েই চলেছে।