মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার পর বিরতি, তবু অনিশ্চয়তা

Image: IANS

পারস্য উপসাগর অঞ্চলে সাম্প্রতিক উত্তেজনা কিছুটা থেমে গেলেও, অনিশ্চয়তার মেঘ এখনো কাটেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চার দিন ধরে চলা পাল্টাপাল্টি হামলার পর আপাতত এক ধরনের বিরতি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এই বিরতি কি স্থায়ী শান্তির ইঙ্গিত, নাকি আরেকটি বড় সংঘাতের আগে সাময়িক বিরাম— এই প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান আলোচনায় বসার জন্য আগ্রহ দেখিয়েছে এবং কাতারের দোহায় একটি বৈঠকের সম্ভাবনার কথা বলেছেন। অন্যদিকে, ইরানের শীর্ষ আলোচক কাজেম গারিবাবাদি এই দাবি সরাসরি নাকচ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও বৈঠকের সূচি এখনও নির্ধারিত হয়নি। এই দ্বৈত অবস্থানই বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় সংকট— বিশ্বাসের অভাব।
এই অবিশ্বাসের মধ্যেই কিছুদিন আগে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি হয়েছিল, যা এই উত্তেজনা প্রশমনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী, ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হ্রাস করবে এবং মার্কিন সমর্থিত নিষেধাজ্ঞার কিছুটা শিথিলতা দেওয়া হবে। পাশাপাশি, গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী খোলা রাখার ব্যাপারেও উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছিল।
এই জলপথটি বিশ্বের তেল পরিবহনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র, ফলে এখানে কোনও সংঘাতের প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নয়, বিশ্ব অর্থনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই চুক্তির পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা হামলা সেই চুক্তির ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। যদিও বর্তমানে জাহাজ চলাচল আবার স্বাভাবিক হওয়ার পথে, তবুও এই স্বাভাবিকতা কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এই চুক্তিকে ‘ইরানি জনগণের বড় জয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে, কাতারে আটকে থাকা ইরানের প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ৬ বিলিয়ন ডলার ফেরত পাওয়ার বিষয়টি তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। এটি ইরানের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে একটি স্বস্তির খবর। কিন্তু অর্থনৈতিক স্বস্তি পেলেই কি রাজনৈতিক উত্তেজনা কমে যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালীতে পুঁতে রাখা মাইন সরানোর বিষয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, এই কাজ শুধুমাত্র তারাই করবে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এই কাজে ফ্রান্স ও ওমানের অংশগ্রহণের কথা বলায় ইরান তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নয়, অন্যান্য দেশগুলিও এই অঞ্চলের পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে চাইছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে প্রয়োজন হচ্ছে স্বচ্ছতা এবং পারস্পরিক আস্থা। একদিকে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বৈঠকের কথা বলে, আর অন্যদিকে ইরান তা অস্বীকার করে, তাহলে আলোচনার পথ কখনোই সুগম হবে না। কূটনীতির মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস, আর সেই বিশ্বাস এখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও দায়িত্ব রয়েছে। কাতার ও পাকিস্তানের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলি ইতিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ভবিষ্যতেও তাদের মতো নিরপেক্ষ শক্তির প্রয়োজন হবে, যারা উভয় পক্ষকে আলোচনার টেবিলে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, এই সংঘাত শুধু দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে— বিশেষ করে জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির উপর। তাই এই উত্তেজনা কমানো এবং স্থায়ী সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।
সব পক্ষেরই মনে রাখা দরকার, যুদ্ধের ভাষা কখনও স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না। আলোচনাই একমাত্র পথ। কিন্তু সেই আলোচনার জন্য প্রয়োজন আন্তরিকতা, স্পষ্টতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা— যার অভাব এখন প্রকটভাবে চোখে পড়ছে। এই ঘাটতি পূরণ না হলে, আজকের এই সাময়িক বিরতি আগামী দিনের আরও বড় সংকটের সূচনা হয়ে উঠতে পারে।