শোভনলাল চক্রবর্তী
বাংলা ভাষা নিয়ে বাঙালি ভদ্রলোকের বাৎসরিক উচ্ছ্বাসের পার্বণ গত একুশে ফেব্রুয়ারি পেরিয়ে এলাম আমরা। ভাষা-সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যে রাজনীতি থেকে শেষ অবধি ভাষা শহিদদের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি এসেছিল, সাম্প্রতিক সময়ে যেন সে প্রতিরোধ সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে আমরা ভাষা দিবসকে দেখছি নেহাত সাংস্কৃতিক উচ্চারণের একটি নির্মল পরিসর হিসাবে। ইতিমধ্যে একটি বহুপ্রচলিত বক্তব্য বাজারে এসেছে, তা হল, বাংলা তার আর্থিক গুরুত্ব হারিয়েছে বলে বাংলা ভাষারও জোর চলে গিয়েছে। কথাটির মধ্যে কয়েক আনা সত্য আছে। কাজের ভাষা হিসাবে বাংলার দর এবং কদর নেই— উচ্চকোটির জন্য সে জায়গা ইংরেজির, আর পিছিয়ে থাকা মানুষের জন্য তা হিন্দি। কিন্তু, ভাষার জোর তো কেবলমাত্র অর্থনৈতিক কারণেই নয়, তার প্রধান গুরুত্ব সংযোগের মাধ্যম হিসাবে এবং সেই নিরিখে বাংলার গুরুত্ব হ্রাস পেয়েছে, এমন দাবি করার কোনও অবকাশ নেই। ভাষার ভিত্তি যে আসলে দুর্বল নয়, এই কথাটি জনমানসে প্রতিষ্ঠা করা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যে কোনও লড়াইয়ের মতোই ভাষার লড়াইয়ের ক্ষেত্রেও ন্যারেটিভ বা বয়ানের তাৎপর্য প্রভূত। বাংলা ইতিমধ্যেই হেরে গিয়েছে, এই বিশ্বাসটি মানুষের মনে গেঁথে দিতে পারলে প্রকৃত পক্ষেই বাংলাকে হারানো সহজতর হবে। উল্টো দিকে, ভাষার জোর সম্বন্ধে ভরসা থাকলে তার হয়ে লড়াইও জোরদার হতে পারে। ইতিহাসের আশ্চর্য চলন, এ বছরের ভাষা দিবসে সেই সব শৈল্পিক প্রকাশ গৌণ হয়েছে; ভাষা-সাম্রাজ্যবাদ-প্রতিরোধী রাজনীতিই আবার মুখ্য প্রশ্ন।
বাংলাভাষী হওয়ার কারণে কী প্রবল রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের সম্মুখীন হতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে, সাম্প্রতিক অতীত তার সাক্ষী। তার প্রত্যক্ষ কারণ নিঃসন্দেহে গৈরিক জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক বাস্তুতন্ত্রের মুসলমান-বিদ্বেষ— কিন্তু বড় ছবিটি দেখতে সমর্থ হলে বোঝা সম্ভব হবে যে, হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থান’-এর রাজনৈতিক প্রকল্পের বিপ্রতীপে ধর্মনির্বিশেষে বাংলা ভাষা একটি বড় প্রতিরোধ। সে প্রতিরোধ যে সর্বদা রাজনৈতিক বিরোধাভাসে ব্যক্ত হয়েছে, তা নয়— কিন্তু হিন্দির রাজনৈতিক ও সামাজিক আধিপত্য বাংলায় এখনও তার প্রশ্নাতীত বিজয়পতাকা গাঁথতে পারেনি। বহু ক্ষেত্রেই বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক পুঁজি সেই আধিপত্যের পথ আটকেছে।
উল্লেখ্য যে, সেই সংস্কৃতি সর্ব ক্ষেত্রে সাবর্ণ সংস্কৃতি নয়— বরং, লোকজ সংস্কৃতির প্রতিরোধ অনুক্ত হলেও বহু ক্ষেত্রেই দৃঢ়তর হয়েছে। বিবিধ ঐতিহাসিক কারণে বাংলা ভাষার উপরে মধ্যবিত্ত সাবর্ণ সংস্কৃতির দাপট বিপুল। ফলে, সেই ‘এলিট’ বৃত্তের বাইরে থাকা ভাষা-সংস্কৃতিকে গৌণ করে রাখার ঘটনাটি বাংলা ভাষার নিজস্ব রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এবার এ কথা বুঝে নেওয়ার সময় হয়েছে যে, সেই সাবর্ণ-উন্নাসিকতায় বাংলা ভাষার যদি ছিটেফোঁটা উপকার হয়ে থাকেও, বাঙালি জাতিসত্তার রাজনীতির বিপুল ক্ষতি হয়েছে। আজ বাংলা ভাষা ও বাঙালি একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে— ভাষা-পরিচিতির কারণে এমন সঙ্ঘবদ্ধ আক্রমণের শিকার বাঙালি ইতিপূর্বে কখনও হয়নি। কাজেই, এই মুহূর্তটি বাংলাভাষী হিসাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার, বাঙালিত্বের সংজ্ঞাকে প্রকৃতার্থে সর্বজনীন করে তোলার। বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন এবার এক হতেই হবে।
হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার আর কোনও উপায়ান্তর নেই।
হিন্দুত্বের রাজনৈতিক প্রকল্পের সাফল্যের জন্য হিন্দি ভাষার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা যেহেতু বাংলার মাটিতে এখনও অনায়ত্ত, তাই বাংলার বিরুদ্ধে আক্রমণের পিছনে সেই কারণটিও অনস্বীকার্য। রামনবমীর অস্ত্র-মিছিল বা ডিজে-তাণ্ডবের হনুমানজয়ন্তী, ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক কোনও আয়ুধই যে বাংলার প্রতিরোধকে ভাঙতে অসমর্থ, সে কথা যত স্পষ্ট হয়েছে, বাংলা ভাষাভাষীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় উৎপীড়নও ততই তীব্র হয়েছে— একে সম্পূর্ণ সমাপতন বলে উড়িয়ে দেওয়া মুশকিল। কিছু কাল ধরেই চার দিকে বাঙালি পরিচয়ের ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ, বিতর্কের এক রকম জোয়ার চলেছে, সম্ভবত যার উৎস বাঙালিবিরোধী রাজনীতির আকস্মিক বিস্ফোরণ। এ এক শুভ লক্ষণ। ইতিহাসগত ও সমাজতত্ত্বগত ভাবে, বাঙালি সমাজ বলতে যা বোঝানোর কথা, আর সাধারণত যা বোঝানো হয়, তার মধ্যে ফারাক এতই বড় যে আত্মসচেতনতার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ আলোড়ন, আন্দোলন ও সংস্কার, সংশোধনের পথে না এগোলে এই সমাজের স্থিতি ও ভবিষ্যৎই অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। তাই এখনই স্পষ্ট হোক যে, বাঙালির সমস্ত ইতিহাস, সমস্ত কীর্তিকাহিনির কেন্দ্রে আছে বাঙালি ‘ভদ্রলোক’ গোষ্ঠী।
জাতীয়তাবাদের উন্মেষকাল থেকেই যে বাঙালির কথা জাতীয় গৌরব বা কৃতিত্ব হিসাবে নথিবদ্ধ করে আসা হয়েছে, তাঁরা সকলেই এই ‘ভদ্রলোক’ বৃত্তে পড়েন। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ে অভিজাত, অর্থাৎ কায়িক শ্রম থেকে দূরে বিরাজিত। প্রধানত শহরের বাসিন্দা, এবং নিশ্চিত ভাবেই হিন্দু— বাঙালি ভদ্রলোক। কেবল হিন্দু নন— মাত্র তিনটি উচ্চজাতির হিন্দুদেরই দেখা যায় এই গোষ্ঠীতে: ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ও বৈদ্য। বাঙালি চেতনা মাত্রেই যেহেতু ‘ভদ্রলোক’ বাঙালি চেতনা, তার বাইরে রয়ে গেল কোন পরিসর, কতখানি পরিসর, তা এই লক্ষণগুলি থেকেই স্পষ্ট। কবে থেকে ‘ভদ্রলোক’ শব্দটি প্রচলিত হল? তা নিয়েও কম বিতর্ক নেই। ১৮২০-র দশকের আগে এর ব্যবহার জানা যায় না, ক্রমশ তা বাড়তে থাকে, এবং সিপাহি বিদ্রোহের পর সরকারিভাবে এবং সামাজিকভাবে প্রচলিত হয়। কলিকাতা কমলালয়, নববাবুবিলাস এই সব বই লিখে খ্যাত ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৭৮৭-১৮৪৮) সম্ভবত শব্দটি প্রথম ছাপার অক্ষরে নিয়ে আসেন।
ভদ্রলোকদেরও এক বড় অংশ ক্রমে নিজেদের সামাজিক গণ্ডি অতিক্রম করতে চেয়েছেন। এই ক্রমবিবর্তনেই তৈরি হয়েছে বাঙালির ‘নতুন ভদ্রলোক’ সমাজ। প্রধানত উপনিবেশ-পরবর্তী বা নব্য-উপনিবেশবাদী যুগে, বাম-লিবারাল মতাদর্শের ছায়াতে ঘটেছে এই ঘটনা। ক্রমে নিম্নবিত্ত দোকানদার, সাধারণ চাকুরিজীবীরাও ‘ভদ্রলোক’ সম্মানপ্রত্যাশী হয়েছেন, গ্রামের সম্পন্ন কৃষক তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মকে ‘ভদ্রলোক’ করতে চেয়েছেন। বুঝতে অসুবিধা নেই, এই বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর দ্বন্দ্ব, জটিল সংঘাত, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটেছে রাজনীতিও। একুশ শতকের বাঙালি রাজনীতির ধারা-উপধারাকে বুঝতে হলে, এবং বিশেষত আজকের বাঙালি পরিচিতিকে কেন্দ্র করে সামাজিক সংঘাত, তাপ-উত্তাপকে যথার্থ প্রেক্ষিতে দেখতে হলে বাঙালি অর্থাৎ বাঙালি ভদ্রলোকের এই ইতিহাস ভুললে চলবে না। ভাষার রাজনীতি, সত্তার রাজনীতি যতই প্রগতিশীল হোক, তাদের সীমাবদ্ধতাও কিন্তু এখন বাংলার রাজনীতিতে প্রাত্যহিকভাবে অনুভবযোগ্য।