কেন্দ্রীয় বাজেট সাধারণত কেবল হিসাবের খাতা নয়, বরং তা দেশের অর্থনৈতিক অভিমুখ, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার স্পষ্ট প্রতিফলন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কেন্দ্রীয় বাজেটও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু এবারের বাজেট সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আশা জাগানোর কথা ছিল, তা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে— এই অভিযোগ ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।
সরকার এই বাজেটকে স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির রূপরেখা হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, দৈনন্দিন জীবনযুদ্ধে জর্জরিত সাধারণ মানুষের জন্য এতে তেমন কোনো তাৎক্ষণিক স্বস্তির বার্তা নেই। মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং মধ্যবিত্তের আয়-ব্যয়ের টানাপোড়েন— এই বাস্তব সমস্যাগুলির মোকাবিলায় বাজেট কার্যত নীরব। আয়কর কাঠামোয় বড় কোনো পরিবর্তন না এনে মধ্যবিত্তের প্রত্যাশা ভেঙেছে সরকার।
সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য বা শিক্ষাখাতে এমন কোনো বড় ঘোষণা নেই, যা সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করতে পারে।
এই বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আঞ্চলিক বৈষম্যের অভিযোগ। পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাজেটে মাত্র কয়েকটি সীমিত ঘোষণা রাখা হয়েছে, যা রাজ্যের প্রয়োজন ও জনসংখ্যার তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি অভিযোগ করেছেন, পশ্চিমবঙ্গকে পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে।
কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলিকে উপেক্ষা করার যে অভিযোগ বহুদিন ধরেই রয়েছে, এই বাজেট সেই ধারণাকেই আরও পোক্ত করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।এই প্রেক্ষাপটে বিহারের সঙ্গে তুলনা অনিবার্য হয়ে ওঠে। লোকসভা নির্বাচনের আগে বিহারের জন্য কেন্দ্রীয় বাজেটে যে উদার বরাদ্দ ও বিশেষ ঘোষণার বন্যা দেখা গিয়েছিল, তা এখনও স্মৃতিতে তাজা। বিশেষ প্যাকেজ, পরিকাঠামো প্রকল্প ও আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি—সব মিলিয়ে বিহার পেয়েছিল রাজনৈতিক গুরুত্বের স্বীকৃতি।
সেই তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ কার্যত উপেক্ষিত। প্রশ্ন উঠছে, উন্নয়নের মাপকাঠি কি আদৌ সমান, না কি তা নির্বাচনী অঙ্কের ওপর নির্ভরশীল? সরকারের যুক্তি, বাজেট খরচের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন এবং মূলধন ব্যয়ের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি লাভের দিকেই নজর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই যুক্তি সাধারণ মানুষের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। কারণ পরিকাঠামো উন্নয়নের সুফল পেতে সময় লাগে, অথচ সাধারণ মানুষের সংকট তাৎক্ষণিক। পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে শিল্প পুনরুজ্জীবন, কর্মসংস্থান ও নগর পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য যে বিশেষ মনোযোগ দরকার, তা বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি।
বাজেটের প্রতিক্রিয়া শেয়ার বাজারেও পড়েছে। ঘোষণার পর বাজারে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গিয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের অনাস্থার ইঙ্গিত। সিকিউরিটিজ ট্রানজ্যাকশন ট্যাক্সে পরিবর্তন এবং কর নীতির অনিশ্চয়তা বাজারের মনোভাবকে আরও দুর্বল করেছে। বাজারের এই প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট করে দেয় যে, বাজেট অর্থনৈতিক আস্থা তৈরিতে সফল হয়নি।
সব মিলিয়ে এই বাজেট একদিকে যেমন সরকারের আর্থিক সংযম ও নিয়ন্ত্রণের দর্শন তুলে ধরে, অন্যদিকে তেমনই রাজনৈতিক পক্ষপাত ও সামাজিক উদাসীনতার অভিযোগকেও উসকে দেয়। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই বাজেট শুধু আর্থিক বঞ্চনার নয়, বরং রাজনৈতিক উপেক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছে। উন্নয়ন যদি সত্যিই সর্বজনীন হয়, তবে তার প্রতিফলন বাজেটের পাতায়ও সমানভাবে পড়া উচিত।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই বাজেট কি দেশের সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে পারবে? নাকি এটি আরও একবার প্রমাণ করবে যে, কেন্দ্রীয় বাজেট ক্রমশই অর্থনৈতিক নথির চেয়ে বেশি রাজনৈতিক দলিল হয়ে উঠছে? পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতা অন্তত সেই প্রশ্নকেই সামনে এনে দাঁড় করাচ্ছে।