সম্প্রতি নিলামে বিক্রি হওয়া তাঁর ৬৮৮টি হাতে লেখা ভাবনা সেই ব্যক্তিগত গান্ধীকেই আমাদের সামনে নতুন করে নিয়ে এসেছে। মুম্বাইয়ের নিলাম সংস্থা স্যাফ্রোনআর্ট আয়োজিত ‘Gandhi: From the Collection of Anand T Hingorani’ শীর্ষক নিলামে গান্ধীর ৬৮৮টি স্বহস্তলিখিত ভাবনা ১৬ কোটি ২০ লক্ষ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সম্প্রতি, ১৯ আগস্ট, অনুষ্ঠিত এই নিলামে দামটি ভারতীয় কোনও ঐতিহাসিক দলিলের জন্য বিশ্বরেকর্ড বলে জানানো হয়েছে। পাণ্ডুলিপিটির পরিচিত নাম ‘A Thought for the Day’।
কিন্তু এই বিপুল অর্থমূল্যের চেয়েও আকর্ষণীয় হল এই লেখাগুলির জন্মকাহিনি। যাঁকে উদ্দেশ করে গান্ধী এই ভাবনাগুলি লিখেছিলেন, তিনি আনন্দ টি. হিঙ্গোরানি— গান্ধীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী, অনুগামী এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মী। অল্প বয়স থেকেই তিনি গান্ধীর ভাবধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৩০ সালের ঐতিহাসিক ডান্ডি অভিযানে তিনি অংশ নেন। সাবরমতী আশ্রমেও তিনি গান্ধীর সঙ্গে কাজ করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে অসহযোগ, আইন অমান্য ও ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
গান্ধীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল কেবল রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক নয়। তাঁদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল গভীর ব্যক্তিগত আস্থার সম্পর্ক। আর সেই সম্পর্কের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী প্রমাণ হয়ে আছে এই ৬৮৮টি লেখা।১৯৪৪ সালে হিঙ্গোরানির স্ত্রী বিদ্যার মৃত্যু হয়। প্রিয়জনকে হারিয়ে তিনি গভীর শোক ও একাকিত্বের মধ্যে পড়েন। সেই সময় তিনি শ্রবণশক্তির সমস্যার চিকিৎসার জন্য প্রকৃতিচিকিৎসার মধ্যেও ছিলেন। নিজের মানসিক অবস্থার কথা তিনি গান্ধীকে জানান।
গান্ধী তখন তাঁকে বক্তৃতা দেননি, কোনও দীর্ঘ উপদেশও দেননি। বরং একটি অত্যন্ত সহজ কাজ করলেন— প্রতিদিন তাঁকে একটি করে ভাবনা লিখে পাঠাতে শুরু করলেন।২০ নভেম্বর ১৯৪৪ থেকে শুরু হয় এই ধারাবাহিকতা। তা চলে ১০ অক্টোবর ১৯৪৬ পর্যন্ত— প্রায় ২৩ মাস। এই সময়ে গান্ধী মোট ৬৮৮টি তারিখ-সহ ভাবনা লিখেছিলেন। স্যাফ্রনআর্ট-এর নিলাম-তালিকা থেকে জানা যায়, প্রথম ৫১৯টি লেখা ১৯৪৪ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৪৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত একটি অ্যালবামের পৃথক পাতায় লেখা হয়েছিল। পরে সেই পাতাগুলি শেষ হয়ে গেলে বাকি ১৬৯টি লেখা একটি নোটবুকে ধারাবাহিকভাবে লেখা হয়। প্রতিটি লেখা ছিল মূলত হিন্দিতে এবং বহু লেখায় গান্ধী কোথায় বসে তা লিখেছিলেন, সেই স্থানটির উল্লেখও রয়েছে।
এই তথ্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলি কোনও সম্পাদকীয় নোট নয়, কোনও স্মৃতিচারণও নয়। এগুলি গান্ধীর নিজের হাতের লেখা— তাঁর চিন্তার প্রত্যক্ষ চিহ্ন।পরে হিঙ্গোরানি এই লেখাগুলি সংরক্ষণ করেন, টাইপ করান, ইংরেজিতে অনুবাদ করেন এবং A Thought for the Day নামে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। অর্থাৎ, গান্ধী লিখেছিলেন, আর হিঙ্গোরানি সেই ব্যক্তিগত আদানপ্রদানকে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করেছিলেন।
সত্য, অহিংসা, আত্মসংযম, ব্রহ্মচর্য, অপরিগ্রহ বা অনাসক্তি, নির্ভয়তা, ধর্মীয় সমতা, প্রার্থনা, সেবা, শ্রম, কর্তব্য, স্বরাজ, নৈতিক দায়িত্ব, নীরবতা, বিবেক, আত্মজ্ঞান এবং ঈশ্বরের সন্ধান— গান্ধীর জীবনদর্শনের বহু প্রধান বিষয় এখানে ফিরে এসেছে।
গান্ধী তখন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক কেন্দ্রীয় চরিত্র। চারদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্রিটিশ শাসনের অবসানের সম্ভাবনা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং দেশভাগের আশঙ্কা ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। এমন এক সময়েও তিনি একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত দুঃখকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিদিন সময় বের করে লিখছেন।এই ঘটনা গান্ধীর ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে সামনে আনে। তাঁর কাছে মানুষের মুক্তি শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছিল না। মানুষের ভিতরের ভয়, আসক্তি, ক্রোধ, দুঃখ ও দুর্বলতা থেকে মুক্তিও তাঁর চিন্তার অংশ ছিল। হিঙ্গোরানিকে লেখা বার্তাগুলি সেই দর্শনেরই ব্যক্তিগত প্রয়োগ।
একটি চিঠিতে গান্ধী তাঁকে বাইরের কোথাও শান্তি খোঁজার বদলে নিজের অন্তরের মধ্যে শান্তি খুঁজে নিতে বলেছিলেন। এই পরামর্শের মধ্যে গান্ধীর দর্শনের একটি কেন্দ্রীয় ধারণা স্পষ্ট— নিজেকে পরিবর্তন না করে বাইরের জগতের পরিবর্তন সম্পূর্ণ হয় না।তাঁর কাছে সত্য ছিল শুধু রাজনৈতিক সংগ্রামের অস্ত্রই নয়, ব্যক্তিজীবনেরও ভিত্তি। অহিংসা ছিল শুধু ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পদ্ধতি নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের নৈতিক আদর্শ। আত্মসংযম ছিল শুধু ব্যক্তিগত সাধনা নয়, সমাজ ও রাজনীতির ক্ষেত্রেও তার প্রয়োজন ছিল।
তাই হিঙ্গোরানিকে লেখা এই ছোট ছোট ভাবনাগুলিতে গান্ধীর বৃহত্তর দর্শনেরই অন্য একটি রূপ দেখা যায়।এই সংগ্রহের আরও একটি আকর্ষণীয় দিক হলো, এর মধ্যে গান্ধীর জীবনের নানা সময়ের চিন্তার ধারাবাহিকতা ধরা পড়েছে। ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৬— ভারতের ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুই বছর। ১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়, স্বাধীনতার প্রশ্নে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ, ১৯৪৫ সালে যুদ্ধের অবসান, ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশদের ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তুতি এবং দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা— সব মিলিয়ে সময়টি ছিল গভীর পরিবর্তনের।
কিন্তু এই পাণ্ডুলিপিতে আমরা সেই রাজনৈতিক ঘটনাগুলির দৈনিক বিবরণ পাই না। বরং পাই এমন একজন মানুষের নৈতিক চিন্তা, যিনি সেই উত্তাল সময়ের মধ্যেও সত্য, আত্মসংযম, ঈশ্বর, কর্তব্য ও মানবিকতার প্রশ্ন নিয়ে ভাবছেন। এখানেই ব্যক্তিগত দলিলটি রাজনৈতিক ইতিহাসের পরিপূরক হয়ে ওঠে।
নিলামে শুধু এই ৬৮৮টি ভাবনাই ছিল না। হিঙ্গোরানি পরিবারের কাছে সংরক্ষিত গান্ধীর চিঠি, পাণ্ডুলিপি, ছবি এবং ব্যক্তিগত সামগ্রী নিয়ে মোট ৮৬টি লট ছিল। তার মধ্যে গান্ধীর ঈশ্বর ও ভগবদ্গীতা সম্পর্কিত তিনটি পাণ্ডুলিপি ও চিঠির সমষ্টি ১ কোটি ৬৮ লক্ষ টাকায় বিক্রি হয়। তাঁর বহনযোগ্য ‘পেটি চরকা’ এবং চরকা কাটার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য নিয়ে লেখা দুটি চিঠি বিক্রি হয় ১ কোটি ২ লক্ষ টাকায়।
এই নিলামের আর্থিক সাফল্য তাই গান্ধী-স্মারকের প্রতি বর্তমান বিশ্বের আগ্রহেরও একটি প্রমাণ। তাঁর হাতে লেখা একটি কাগজ আজও সংগ্রাহক ও ইতিহাসবিদদের কাছে এত মূল্যবান— কারণ সেই কাগজে শুধু কালিতে লেখা কথা নেই, আছে একটি যুগের প্রত্যক্ষ স্পর্শ।
একদিকে রয়েছে ব্যক্তিগত সংগ্রাহক ও পরিবারের অধিকার। হিঙ্গোরানি পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে এই দলিলগুলি যত্ন করে সংরক্ষণ করেছে। অন্যদিকে রয়েছে জাতীয় ঐতিহ্যের প্রশ্ন। গান্ধীর হাতে লেখা মূল চিঠি, পাণ্ডুলিপি এবং ব্যক্তিগত সামগ্রী কি কেবল ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত?
জাতীয় গান্ধী জাদুঘরের পরিচালক এ. আন্নামালাই এই নিলামকে গভীরভাবে বেদনাদায়ক বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা হল, গান্ধীর মূল চিঠি ও পাণ্ডুলিপি ভারতের সম্মিলিত ইতিহাসের অংশ। এগুলি এমনভাবে সংরক্ষণ করা দরকার, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এগুলি দেখতে, পড়তে এবং গবেষণা করতে পারে।
এই উদ্বেগ অমূলক নয়। কোনও ঐতিহাসিক দলিল একবার ব্যক্তিগত সংগ্রহে চলে গেলে তার গবেষণার সুযোগ সীমিত হতে পারে। অন্যদিকে নিলামের মাধ্যমে কোনও গুরুত্বপূর্ণ দলিল প্রকাশ্যে আসার ফলে তার অস্তিত্ব, গুরুত্ব এবং সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নতুন করে সচেতনতা তৈরি হয়। তাই ব্যক্তিগত মালিকানা ও জনসাধারণের ঐতিহাসিক অধিকার— এই দুইয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্যের প্রশ্ন এখানে থেকেই যায়।
তবু ১৬ কোটি ২০ লক্ষ টাকার অঙ্কটি যতই চমকপ্রদ হোক, এই গল্পের আসল মূল্য সেখানে নয়। আসল মূল্য লুকিয়ে আছে সেই মুহূর্তে, যখন একজন শোকাহত মানুষ তাঁর বন্ধুকে নিজের দুঃখের কথা বলেছিলেন। আর সেই বন্ধু, যিনি একই সঙ্গে ছিলেন দেশের অন্যতম ব্যস্ত রাজনৈতিক নেতা, প্রতিদিন তাঁর জন্য কয়েকটি কথা লিখে দেওয়ার সময় বের করেছিলেন।
হয়তো গান্ধী নিজেও তখন ভাবেননি যে, এই ব্যক্তিগত কথাগুলি একদিন ইতিহাসের সম্পদ হয়ে উঠবে। তিনি লিখেছিলেন একজন মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য। কিন্তু সময় সেই ব্যক্তিগত সম্পর্ককে রূপ দিয়েছে এক অসাধারণ ঐতিহাসিক দলিলে।
রাজনীতির গান্ধীকে ইতিহাস বহুবার বিচার করেছে। তাঁর সাফল্য, ব্যর্থতা, মতাদর্শ, সিদ্ধান্ত— সব নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। কিন্তু হিঙ্গোরানিকে লেখা এই ৬৮৮টি ভাবনা আমাদের অন্য একটি দরজা খুলে দেয়। সেই দরজা দিয়ে দেখা যায় তাঁর ব্যক্তিগত মানবিকতা, তাঁর আত্মিক চিন্তা এবং তাঁর কথার সঙ্গে নিজের জীবনকে মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা।
এই কারণেই ‘A Thought for the Day’ শুধু একটি পাণ্ডুলিপি নয়। এটি এক বন্ধুত্বের দলিল, এক শোকাহত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দলিল এবং একই সঙ্গে গান্ধীর চিন্তা ও সাধনার এক বিরল আত্মপ্রতিকৃতি।
১৬ কোটি ২০ লক্ষ টাকা তার নিলামমূল্য হতে পারে। কিন্তু একজন মানুষের দুঃখের সময়ে আর-একজন মানুষ প্রতিদিন একটি করে কথা লিখে পাশে থাকার যে মানবিক মূল্য— তার কোনও নিলামমূল্য হয় না।সম্ভবত এটাই এই ৬৮৮টি পাতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা। ইতিহাসের বড় মানুষকে কখনও কখনও বুঝতে হলে তাঁর বড় বক্তৃতা নয়, তাঁর লেখা ছোট্ট একটি ব্যক্তিগত বাক্যের দিকেও তাকাতে হয়।