পূর্ব প্রকাশিতর পর
তখন মিউনিখে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেনের ভূমিকা প্রসঙ্গে জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রী ইওয়াহিম রিবেন্ট্রপ বলেছিল: ‘এই বুড়োটি আজ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মৃত্যুর রায় স্বাক্ষর করল এবং এই রায়টি কাজে পরিণত করার জন্য তাতে আমাদের কেবল একটি তারিখ বসালেই চলবে।’
ইউরোপে পশ্চিমী রাষ্ট্রসমূহের নীতির সঙ্গে দূর প্রাচ্যে আগ্রাসী জাপানের ‘স্বস্তিকরণ’ নীতির পূর্ণ সঙ্গতি ছিল। ১৯৩৯ সালের জুলাই মাসে একটি ইঙ্গো-জাপানী চুক্তি সম্পাদিত হয়, যা নিজ সারাংশের দিক থেকে চীনের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ আর জাপানী সাম্রাজ্যবাদের খোলাখুলি ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এই চুক্তিটি ছিল চীনে জাপানী বাহিনীগুলোকে ইংলন্ডের গ্যারান্টি দানের সমান,— জাপানী সৈন্যরা চীনের ভূখন্ডকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মঙ্গোলিয়ার বিরুদ্ধে আক্রমণের পাদভূমি হিশেবে ব্যবহার করতে পারবে।
১৯৩৮ সালের ১ অক্টোবর তারিখে ফ্যাসিস্ট জার্মানি সুদেতস অঞ্চলে নিজের সৈন্য ঢুকিয়ে দেয়, আর ১৯৩৯ সালে মার্চ মাসে সারা চেকোস্লোভাকিয়া দখল করে নেয়। ১৯৩৯ সালের বসন্তে নাৎসিরা লিথুয়ানিয়ার ক্লাইপেদা জেলা অধিকার করে, এবং রুমানিয়ার উপর একটি অন্যায় ‘অর্থৈনতিক’ চুক্তি চাপিয়ে দেয় যা তার অর্থনীতিকে জার্মানির অধীনস্থ করে। ১৯৩৯ সালের এপ্রিল মাসে ফ্যাসিস্ট ইতালি আলবানিয়া আত্মসাৎ করে ফেলে। ১৯৩৮ সালের শেষ দিকে জার্মানি তথাকথিত ডানজিগ সঙ্কট সৃষ্টি করে, যার উদ্দেশ্য ছিল— স্বাধীন ডানজিগ শহরের প্রতি ‘ভার্সাই-এর অবিচার’ দূরীকরণের দাবিদাওয়ার আড়ালে পোল্যান্ড আক্রমণ করা। ইংলন্ড ও ফ্রান্স তাদের রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে পোল্যান্ড, রুমানিয়া, গ্রীস ও তুরস্ককে তথাকথিত ‘নিরাপত্তার নিশ্চয়তা’ দিল, এবং তাতে পোল্যান্ডকে এই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হল যে ফ্যাসিস্ট জার্মানি কর্তৃক সে আক্রান্ত হলে তাকে সামরিক সহায়তা প্রদান করা হবে। কিন্তু পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ থেকে যেমনটি দেখা গেল, এই সমস্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি।
১৯৩৯ সালের এপ্রিল-মে মাসে জার্মানি ১৯৩৫ সালে সম্পাদিত ইঙ্গো-জার্মান সমুদ্র চুক্তি বাতিল করে দেয়, ১৯৩৪ সালে পোল্যান্ডের সঙ্গে স্বাক্ষরিত অনাক্রমণ বিষয়ক চুক্তিটি ভঙ্গ করে দেয় এবং ইতালির সঙ্গে তথাকথিত স্টিল প্যাক্ট সম্পাদন করে যা অনুসারে পশ্চিমী রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে যুদ্ধ বাধলে ইতালীয় সরকার জার্মানিকে সহায়তা করতে বাধ্য ছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে জার্মানির ক্ষমতাসম্পন্ন সামরিক যন্ত্র ছিল। ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর নাগাদ তার সশস্ত্র বাহিনীতে ছিল ৪৬ লক্ষ লোক, ২৬ হাজার তোপ আর মর্টার কামান (বিমান ধ্বংসী কামান ছাড়া), ৩,১৯৫টি ট্যাঙ্ক, ৪.০৯৩টি জঙ্গী বিমান, প্রধান প্রধান শ্রেণীর ১০৭টি যুদ্ধ-জাহাজ, যার মধ্যে ৫৭টি ডুবো জাহাজও ছিল।
ওই সময় ফ্রান্সের সশস্ত্র বাহিনীতে ছিল ২৬ লক্ষ ৭৪ হাজার লোক, ২৬ সহস্রাধিক তোপ আর মর্টার কামান, ৩.১০০টি ট্যাঙ্ক, ৩.৩৩৫টি বিমান, প্রধান প্রধান শ্রেণীর ১৭৪টি যুদ্ধ-জাহাজ, যার মধ্যে ৭৭টি ডুবো জাহাজ।
(ক্রমশ)