পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারে একুশে জুলাই এমন এক দিন, যা কেবল একটি স্মরণসভা বা দলীয় কর্মসূচি নয়— বরং ক্ষমতা, স্মৃতি, আবেগ ও প্রতিযোগিতার বহুমাত্রিক এক রাজনৈতিক মঞ্চ। তিন দশক আগে যে দিনটি শুরু হয়েছিল পুলিশের গুলিতে নিহত ১৩ জন যুব কংগ্রেস কর্মীর স্মরণে, আজ তা পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের এক বার্ষিক পরীক্ষাক্ষেত্রে। কিন্তু চলতি বছরের প্রেক্ষাপট ভিন্ন— এখানে ঐতিহ্যের সঙ্গে জুড়েছে বিভাজন, নেতৃত্বের প্রশ্ন এবং ভবিষ্যৎ দখলের লড়াই।
১৯৯৩ সালের একুশে জুলাইয়ের ঘটনাটি ছিল এক অগ্নিগর্ভ রাজনৈতিক মুহূর্তের ফল। ওই ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ১৯৯৩-এর ২২ জুলাইয়ে প্রকাশিত সমস্ত সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, সেদিন যুব কংগ্রেস মহাকরণ অবরোধের ডাক দিয়েছিল রাজ্যে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার অভিযোগ এবং রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করার দাবিতে। কিন্তু তার কয়েক বছর পর থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করতে থাকেন যে, নির্বাচনে সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করার দাবিতে যুব কংগ্রেস সেদিন মহাকরণ অভিযানের ডাক দিয়েছিল। কেন এই ভাষ্য বদল, তার অবশ্য উত্তর নেই।
যাই হোক, ১৯৯৩ সালের সেই মহাকরণ অভিযানে পুলিশের গুলিতে ১৩ জন কর্মীর মৃত্যু হয়। আর সেই ঘটনা তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তোলে। সেই সময় যুব কংগ্রেসের নেতৃত্বে ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই ঘটনার পর থেকেই একুশে জুলাই স্মরণ দিবস হিসেবে পালিত হতে থাকে, যা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রতীক হয়ে ওঠে।
পরবর্তী সময়ে কংগ্রেস ছেড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস গঠন এবং তার রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে একুশে জুলাইয়ের কর্মসূচি নতুন মাত্রা পায়। এটি আর শুধু স্মরণসভা থাকে না— বরং দলীয় শক্তি প্রদর্শন, সাংগঠনিক বার্তা প্রদান এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রণকৌশল ঘোষণার প্রধান মঞ্চ হয়ে ওঠে। এসপ্ল্যানেড চত্বরে লক্ষাধিক কর্মীর সমাবেশ, জেলা থেকে আগত কর্মীদের ঢল, বিশাল মঞ্চ, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি এবং সাংস্কৃতিক আবহ— সব মিলিয়ে এটি এক ‘রাজনৈতিক উৎসব’-এর রূপ নেয়।
এই মঞ্চের আরেকটি তাৎপর্য ছিল এর কৌশলগত ব্যবহার। প্রতি বছর এই দিনেই দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কর্মীদের উদ্দেশে বার্তা দিতেন— আগামী দিনে কীভাবে সংগঠন চলবে, কোন ইস্যুকে সামনে রেখে আন্দোলন হবে, কীভাবে বিরোধীদের মোকাবিলা করতে হবে। এক অর্থে, এটি ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের বার্ষিক ‘দিশা নির্ধারণ সভা’। ফলে একুশে জুলাই কেবল অতীতের স্মরণ নয়, ভবিষ্যতের রূপরেখাও নির্ধারণ করত।
তবে এই ঐতিহ্যগত ধারাবাহিকতায় এবার বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদল এবং তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ ভাঙনের ফলে একুশে জুলাই এখন একাধিক শিবিরের মধ্যে প্রতিযোগিতার দিন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন মূল শিবির ছাড়াও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোষ্ঠী, তৃণমূল ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া ‘বিক্ষুব্ধ’ নেতাদের দল— এমনকি কংগ্রেসও আলাদা করে এই দিন পালন করছে। ফলে একই দিনের উপর একাধিক দাবিদার তৈরি হয়েছে, যা এই কর্মসূচির রাজনৈতিক গুরুত্বকে আরও জটিল করে তুলেছে।
প্রশ্ন উঠছে— কেন এতগুলো শিবির একুশে জুলাই পালন করতে এতটা আগ্রহী? এর উত্তর নিহিত রয়েছে ‘রাজনৈতিক বৈধতা’ এবং ‘সাংগঠনিক প্রভাব’-এর প্রশ্নে। তৃণমূল কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরে এই দিনটিকে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে স্থাপন করেছে। ফলে এই দিনটি দখল মানেই সেই ঐতিহ্যের উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। ভাঙনের পরে প্রতিটি শিবিরই প্রমাণ করতে চাইছে যে, প্রকৃত উত্তরাধিকার তাদের হাতেই রয়েছে।
এই প্রতিযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল কর্মীদের উপস্থিতি। মাঠপর্যায়ে কাজ করা কর্মীরাই যে কোনও রাজনৈতিক দলের আসল শক্তি। কোন শিবিরের সভায় কত কর্মী উপস্থিত হলেন, শহীদ পরিবারের সদস্যরা কার মঞ্চে এলেন— এসবই এখন রাজনৈতিক বার্তার অংশ। এক অর্থে, একুশে জুলাই এখন সংখ্যার রাজনীতি, আবেগের রাজনীতি এবং প্রতীকী ক্ষমতার লড়াইয়ের সম্মিলিত ক্ষেত্র।
এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের অবস্থানও লক্ষণীয়। যদিও ১৯৯৩ সালের ঘটনাটি মূলত যুব কংগ্রেসের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ঘটেছিল, তবুও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দিনটির উপর তাদের প্রভাব কমেছে। তৃণমূল কংগ্রেস এই দিনটিকে অনেক বেশি কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছে। তবুও চলতি বছরে কংগ্রেস আবার এই দিনটিকে সামনে আনার চেষ্টা করছে, এমনকি শর্তসাপেক্ষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমন্ত্রণ জানানোর ঘটনাও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। অন্যদিকে, বর্তমান শাসকদল বিজেপির ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। তারা একুশে জুলাইয়ের ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট বিধানসভায় পেশ করে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। রিপোর্টে পুলিশের গুলি চালানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে এবং তৎকালীন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি অভিযোগ উঠেছে যে পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকার এই রিপোর্ট জনসমক্ষে আনেনি। এই অবস্থান বিজেপিকে একদিকে ‘ন্যায়বিচারের দাবিদার’ হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে বিরোধীদের বিভাজনকে আরও প্রকট করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিভাজনই বর্তমানে বিজেপির সবচেয়ে বড় সুবিধা। একটি শক্তিশালী বিরোধী শক্তির অনুপস্থিতি যে কোনও শাসকদলের জন্য সুবিধাজনক। তৃণমূল কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে প্রধান বিরোধী শক্তি ছিল। কিন্তু এখন সেই দলই যদি একাধিক অংশে বিভক্ত হয়, তাহলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ভারসাম্য বদলে যায়। এতে শাসকদল তুলনামূলকভাবে কম চাপে থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে একুশে জুলাইয়ের রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও গভীর। এটি এখন আর শুধুমাত্র অতীতের স্মৃতিচারণ নয়— বরং বর্তমানের ক্ষমতার সমীকরণ এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক দিকনির্দেশ নির্ধারণের একটি সূচক। কোন শিবির কতটা শক্তিশালী, কার প্রভাব বেশি, কে জনসমর্থন ধরে রাখতে পারছে— এই সব প্রশ্নের আংশিক উত্তর মিলতে পারে এই দিনের সমাবেশগুলির মাধ্যমে।
তবে এই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মাঝে একটি মৌলিক প্রশ্নও থেকে যায়— ১৯৯৩ সালের সেই ঘটনার প্রকৃত বিচার কি আদৌ হয়েছে? তিন দশক পরেও নিহতদের একজনের পরিচয় অজানা, তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত, এবং রাজনৈতিক দলগুলি সেই ঘটনার স্মৃতিকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করছে। ফলে শহীদদের স্মরণ অনেক সময়ই রাজনৈতিক কৌশলের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে।
এখানেই একুশে জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব। একদিকে এটি গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে প্রাণ দেওয়া মানুষের স্মৃতি, অন্যদিকে এটি রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের হাতিয়ার। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা কি সম্ভব? নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতা সবসময়ই স্মৃতিকে গ্রাস করবে?
চলতি বছরের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্ন আরও তীব্র। কারণ এখানে শুধু দলীয় প্রতিযোগিতা নয়, নেতৃত্বের প্রশ্ন, সংগঠনের ভবিষ্যৎ এবং রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্গঠনের ইঙ্গিতও রয়েছে। একুশে জুলাই এখন এক অর্থে ‘লিটমাস টেস্ট’— যেখানে বোঝা যাবে কোন শক্তি কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারছে।
একুশে জুলাই হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক লড়াইয়ের ভরকেন্দ্র
ফাইল চিত্র
একুশে জুলাই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি প্রতীক— যার মধ্যে রয়েছে ইতিহাস, আবেগ, সংগ্রাম এবং ক্ষমতার লড়াই। এই প্রতীকের দখল নিয়ে যে প্রতিযোগিতা চলছে, তা শুধু একটি দিনের নয়— বরং আগামী দিনের রাজনীতির ইঙ্গিত বহন করছে। আর সেই কারণেই প্রতি বছর এই দিনটি ঘিরে উত্তেজনা, বিতর্ক এবং আগ্রহ— সবই ক্রমশ বেড়েই চলেছে।