রথযাত্রা ভারতে খুবই বিখ্যাত। এই একটি দিন ভগবান শ্রীজগন্নাথদেব বলা যেতে পারে নিজের বাসগৃহ থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের সামনে হাজির হন। জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে যে কোনও মানুষ এই দিন জগন্নাথকে স্পর্শ করতে পারে। পুরীর রথযাত্রা গোটা ভারত কেন গোটা বিশ্বব্যাপী খ্যাতি রয়েছে। পুরীর রথযাত্রার আজ যে এত খ্যাতি তার প্রধান কারণ, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। তাঁর যোগদানে এই রথযাত্রা এক আলাদা মর্যাদা লাভ করতো। শ্রীচৈতন্যকে নিয়ে রচিত বিভিন্ন গ্রন্থে সেকথা সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে।
চৈতন্যদেবের লীলাস্থল পুরী। তাঁর দৈবলীলা চাক্ষুষ করে ধন্য নীলাচলবাসী। একবার মহাপ্রভুর ইচ্ছা হল যে, তিনি আসন্ন রথযাত্রায় গুণ্ডিচা মন্দির-মার্জনা সেবা করবেন। তার মতে গুণ্ডিচা মন্দির শ্রীকৃষ্ণের কুঞ্জবন। সেই কুঞ্জবনে তাঁর শুভাগমন হবে। ‘কাল আসবে প্রাণবন্ধুয়া/ আজ কুঞ্জ সাজ গো।’ যত দ্রুত সম্ভব এই কুঞ্জবনকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলা একান্ত দরকার। সেই কাজটিই সুষ্ঠুভাবে করার জন্য ব্যগ্রতার শেষ নেই মহাপ্রভুর। পরদিন প্রভাতেই সঙ্গীসাথীদের নিয়ে গুণ্ডিচা মন্দিরে পৌঁছে গেলেন। ইতিমধ্যে জগন্নাথ মন্দিরের এক পরিছা গুণ্ডিচা মন্দিরে একশো মাটির ঘট আনিয়ে রেখেছেন। গুণ্ডিচা মন্দিরে পৌঁছনোর পর শ্রীচৈতন্য প্রত্যেকের হাতে তুলে দিলেন একটি করে মার্জনী। তিনিই প্রথমে মন্দিরের অভ্যন্তর মার্জন শুরু করলেন। যে রত্নবেদিতে জগন্নাথদেব, বলভদ্র ও সুভদ্রা বিরাজ করবেন সেই বেদিটিও নিজের হাতে মার্জন করলেন। এখন একে শোধন করা বলে।
সঙ্গীসাথীরা কে কতটা কাজ করছে সেদিকেও তীক্ষ্ণ নজর মহাপ্রভুর। ‘প্রভু কহে কে কত করিয়াছে মার্জন/ তৃণ-ধূলি পরিমাণে জানিব পরিশ্রম।’ কীভাবে কত সুন্দর করে মার্জন করা সম্ভব সেটা ভক্তদের নিজেই দেখিয়ে দেন। কৃষ্ণনামের সঙ্গে মন্দির মার্জনের কাজ পুরোদমে চলতে থাকে। কেউ ভালোভাবে মার্জন করছে দেখে মুক্তকণ্ঠে তার প্রশংসা করেন মহাপ্রভু। আবার কেউ ফাঁকি দিচ্ছে দেখলে মৃদু হেসে তাকে ভর্ৎসনাও করেছেন।
শ্রীচৈতন্যই কর্তব্য পালনের গুরুত্ব সম্বন্ধে শিষ্যদের শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর মার্জনের ধরন এতটাই নিখুঁত যে, সূক্ষ্মধূলি, তৃণ, কাঁকর সব দূরীভূত হল। ‘ভালমত শোধ সব প্রভুর অন্তঃপুর।’
ইন্দ্রদ্যুম্ন সরোবরের জলে গুণ্ডিচা মন্দির দু’বার শোধন করার পর চৈতন্যদেব তাঁর পরিধেয় বস্ত্রের অংশ দিয়ে রত্নবেদি প্রক্ষালন করলেন। ভক্তরাও হাতে হাতে জলভরা ঘট এগিয়ে দেন মহাপ্রভুকে। ‘কেহ জলঘট দেয় মহাপ্রভুর করে।/ কেহ জল দেয় তাঁর চরণ উপরে।।’ গুণ্ডিচা মন্দির ভালোভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়ায় শ্রীচৈতন্যের মনে আনন্দ ধরে না। কুঞ্জবন প্রস্তুত। কৃষ্ণের কথা ভাবতে ভাবতে মহাপ্রভু মহাভাবে বিভোর। রথের দিনে রথারুঠ জগন্নাথকে দেখে মহাপ্রভুর মনে আবার মহাভাবের উদয় হয়। তিনি ‘মণিমা’ বলে উচ্চধ্বনি করে ওঠেন। ওড়িয়াতে ‘মণিমা’ কথার অর্থ প্রভু।
চৈতন্য জীবনীকারদের লেখা থেকে জানা যাচ্ছে রথাযাত্রার শুভমুহূর্ত সমাগত। দুন্দুভি বাজল। কাঁসর-ঘণ্টা বাজল। মহাপ্রভু ভক্তদের কপালে চন্দনের ফোঁটা পরিয়ে দিলেন। প্রত্যেকের গলায় পরিয়ে দিলেন ফুলের মালা পরমানন্দপুরী, ভারতী ব্রহ্মানন্দ, অদ্বৈত আচার্য, নিত্যানন্দপ্রভু এঁরা মহাপ্রভুর পাশে। যাঁরা কীর্তন করবেন তাঁদেরও মালা-চন্দন দিলেন মহাপ্রভু। এঁদের দলনেতা স্বরূপ দামোদর ও শ্রীবাস। চার সম্প্রদায়ের ছয়জন করে মোট ২৪ জন গায়ক। দু’জন করে চার সম্প্রদায়ের মোট ৮ জন মৃদঙ্গবাদক। ৩২ জনকে চারটি দলে বিভক্ত করা হল মহাপ্রভুর ইচ্ছাতেই। রথের আগে চার সম্প্রদায়ের কীর্তনীয়ারা গাইছেন আর নৃত্য করছেন। রথের দু’পাশে আরও দুই সম্প্রদায়ের লোকজন নৃত্যরত। রথের পিছনে অন্য একটি সম্প্রদায়ের লোকজন। সাত সম্প্রদায়ের চোদ্দোটি মাদল বাজতে থাকে।
মহাপ্রভুও মহানন্দে ‘হরি হরি’ বলে ওঠেন। ‘জয় জগন্নাথ’ বলে নাচতে থাকেন। ধীরে ধীরে রথ এগিয়ে চলে।
এই রথযাত্রায় রাজা প্রতাপরুদ্রকে বুকে টেনে নেন শ্রীচৈতন্য।
মহাপ্রভুর নৃত্য-গীত দেখে জগন্নাথের রথটানা মাঝে মাঝেই থেমে যায়। পথে ভিড় করা লোকজন অনিমেষ নয়নে শ্রীচৈতন্যের দিকে তাকিয়ে শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে রয়েছে— ‘উদ্দণ্ড নৃত্যে প্রভুর অদ্ভুত বিকার।/ অষ্ট সাত্ত্বিক ভাবোদয় হয় সমকাল।।/ কভু স্তম্ভ কভু প্রভু ভূমিতে পড়য়।/ শুষ্ককাষ্ঠসম হস্ত পদ না চলয়।’ আবার রথের রশিতে টান পড়ে। নৃত্যগীত সহযোগে ভক্তদের শোভাযাত্রাও এগিয়ে চলে আর এদিকে জগন্নাথে মগ্ন মহাপ্রভু দু’হাত মাথায় তুলে নাচতে নাচতে এগিয়ে চলেন। ‘নাচিতে নাচিতে প্রভুর হৈল ভাবান্তর/ হস্ত তুলি শ্লোক পড়ে করি উচ্চস্বর।’ উল্টোরথেও সেই একই চৈতন্যময় চিত্র।
চৈতন্যদেবের আকস্মিক অন্তর্ধানের পরও পুরীর রথ ছিল চৈতন্যময়। চৈতন্যদেবের অন্তর্ধানের পর, চৈতন্য অনুরাগীরা ভীষণভাবে ভেঙে পড়েন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন রাজা প্রতাপ রুদ্রও। মূলত তাঁরই অনুরোধে চৈতন্যদেব এবং রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে একটি নাটকও লেখা হয়। যা লিখেছিলেন কবি কর্ণপূর। এই নাটকের প্রস্তাবনা হচ্ছে— রথযাত্রায় সমাগত ভক্তদের কথোপকথনে। চৈতন্যদেবের তিরোধান ঘটেছে। সুতরাং বিধিবিধান অনুসারে রথযাত্রা হচ্ছে বটে, কিন্তু কারও প্রাণে আনন্দ নেই। ভক্তেরা বিরহে অধীর। গজপতি রাজা প্রতাপরুদ্রদেব সোনার ঝাড়ু নিয়ে পথ পরিষ্কার করছেন, কিন্তু মন তাঁর বিমুখ হয়ে আছে। তিনি পরমানন্দকে ডেকে নিভৃতে বলছেন, ‘দেখুন, সেই নীলগিরির অধীশ্বর জগন্নাথ আছেন, সেই রথযাত্রা আছে, বৈভব আছে, সেই গুণ্ডিচামন্দির, দিগ্বিদিক থেকে আগত দর্শনার্থী ভক্তকুল, সেই বাদ্য, সেই আরতি, সেই নন্দনবনকে হার মানাতে পারে এমন সব উপবন আছে, সবই আগের মতোই রয়েছে, শুধু মহাপ্রভু নেই বলে আমার মনে হচ্ছে যেন কিছুতেই আর কিছু নেই! মহাপ্রভুং বত বিনা শূন্যানি মন্যামহে।
রথ ও চৈতন্যদেব, ইতিহাসের সঙ্গে মিশে থাকে এক অন্য গল্প
যাই হোক, প্রতাপরুদ্রদেব চৈতন্যদেবের মহিমা অনেক বললেন, চৈতন্যবিরহে নিজের ব্যাকুলতার কথাও বললেন। এবং সেই বিরহজ্বালা মেটানোর উপায় হিসেবে চৈতন্যের লীলাকথা নিয়ে পরমানন্দকে একটি নাটক রচনার দায়িত্ব দিলেন। পরমানন্দ বলছেন যে, হৃদয়ের অন্ধকার দূর করার জন্য চৈতন্য চন্দ্রের উদয়। বিশেষ করে লক্ষ করতে হয় যে, সেই চাঁদ উদয়ের ঘটনাটি ঘটছে রাজা প্রতাপরুদ্রের অনুরোধে। তার উপর প্রতাপরুদ্রদেব নিজে এই নাটকের অন্যতম চরিত্রও বটে।