সমাজের তথাকথিত নৈতিকতা, পাপ–পুণ্যের দ্বন্দ্ব আর প্রান্তিক মানুষের জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে সামনে এনে যাদবপুরে মঞ্চস্থ হল দিল্লির নাট্যদল যাপনচিত্রের প্রযোজনা ‘পাপ’। শুক্রবার সন্ধ্যায় যাদবপুরের ত্রিগুণা সেন মেমোরিয়াল অডিটোরিয়ামে নাটকটি মঞ্চস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দর্শকাসনে তৈরি হয় টানটান নীরবতা—যা শেষ দৃশ্যে ভেঙে পড়ে দীর্ঘ করতালি আর দাঁড়িয়ে অভিনন্দনে।
সমরেশ বসুর মূল গল্প অবলম্বনে নাট্যরূপ দিয়েছেন বাংলাদেশের নাট্যকার সুমন টিংকু। নির্দেশনার দায়িত্বের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় চরিত্র কালুরামে অভিনয় করেছেন সুহান বসু। গল্পের মূল সুর অক্ষুণ্ণ রেখে সমকালীন সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে নাটকটিকে যুক্ত করার প্রয়াস স্পষ্ট। পাপ কাকে বলে, কে পাপী আর কে পুণ্যবান—এই প্রশ্নগুলিই নাটকের পরতে পরতে দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে।
নাটক জুড়ে মানসিক টানাপোড়েন, আশঙ্কা আর সংশয়ের আবহ দর্শকদের গভীরে টেনে নেয়। বিশেষ করে শেষের একক সংলাপে কালুরামের চরিত্রে সুহান বসুর সংযত অথচ তীব্র আবেগ দর্শকদের শিহরিত করে তোলে। সেই মুহূর্তে বলরামের ভূমিকায় সুমন কুন্ডুর নির্বাক উপস্থিতি দৃশ্যটিকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। পার্বতীর চরিত্রে মধুমিতা ব্যানার্জির অভিনয় নাটকে আবেগের গভীরতা বাড়িয়েছে। জগাই চরিত্রে দেবপ্রিয় দত্ত, কমলা দিদির ভূমিকায় প্রাপ্তি ঘোষ দর্শকদের মন জয় করেন। ডোমের চরিত্রে সুকুমার সর্দার ও সুবর্ণ ঘোষ এবং পুরোহিতের ভূমিকায় অচিন চৌধুরী নিজ নিজ চরিত্রে বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় উপহার দেন।
নাটকের আবহ প্রক্ষেপণে সানন্দিতা চ্যাটার্জির কাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শ্মশান দৃশ্যে সারাক্ষণ কাঠ পোড়ার শব্দ নাটকের বিষণ্ণতা ও বাস্তবতাকে আরও তীব্র করে তোলে। আলো পরিকল্পনায় রঞ্জন বসু এবং প্রক্ষেপণে গোকুল চ্যাটার্জির কাজ দৃশ্যগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছে। আলো–আঁধারির খেলায় বিশেষ করে শ্মশান ও চিতার দৃশ্য দর্শকদের মনে গভীর ছাপ ফেলে। নির্দেশনার পাশাপাশি মঞ্চসজ্জা ও মেকআপের দায়িত্বও সামলেছেন সুহান বসু।
নাটক শেষে দর্শকদের প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট—‘পাপ’ কেবল একটি নাটক নয়, বরং সমাজের সামনে ধরা এক তীক্ষ্ণ আয়না। যাপনচিত্রের এই প্রযোজনা আবারও প্রমাণ করল, অর্থবহ ও চিন্তাশীল নাটক আজও দর্শকের মন জয় করতে সক্ষম।