গভীর নির্জন পথের গদ্যপদ্যপ্রবন্ধ আয়োজিত চতুর্থ জাতীয় কবিতা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ২-৪ জানুয়ারি ২০২৬ কলকাতা ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর আর্টস, লিটারেচার অ্যান্ড কালচারে। তিনদিনের এই উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন বাংলা সহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন ভাষার দুই শতাধিক কবি। উৎসবের উদ্বোধন করেন কালীকৃষ্ণ গুহ। প্রধান অতিথি ছিলেন রণজিৎ দাশ। এই উৎসবে গদ্যপদ্যপ্রবন্ধ সম্মাননা ২০২৫ প্রদান করা হয় তামিল কবি সবরিনাথন এবং বাংলা ভাষার কবি চৈতালী চট্টোপাধ্যায় ও দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সম্মাননা প্রাপকদের হাতে তুলে দেন প্রসূন বন্দোপাধ্যায়, সনেট মণ্ডল ও সমীরণ চট্টোপাধ্যায়।
উৎসব উপলক্ষ্যে প্রকাশ পায় অংশুমান কর সম্পাদিত “অন্ধের সমাজে একা: নীরেন্দ্রনাথের কবিতাযাপন” বইটি। প্রকাশ করেন আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিরূপ সরকার। ‘নীরেন্দ্রনাথ পিতা ও কবিতা’ এই বিষয়ে আলোচনা করেন কবির দুই কন্যা সোনালি চক্রবর্তী ব্যানার্জি ও শিউলি সরকার। উৎসবের তিনদিন কবিতাপাঠ ছাড়াও ছিল বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা সভা ও বিতর্ক। ‘সভার মতে, দাদা ও দিদিরা বাংলা কবিতার ক্ষতি করছেন’–এই বিষয়ে বিতর্কে অংশগ্রহণ করেছিলেন সব্যসাচী মজুমদার, আত্রেয়ী চক্রবর্তী, সেলিম মল্লিক ও শুভ্রা মুখার্জি। সভামুখ্য ছিলেন তুষার পণ্ডিত।
আরেকটি বিতর্কের বিষয় ছিল ‘সভার মতে, কবিদের দাপটে এখন এ-বাংলায় গদ্যসাহিত্য কোণঠাসা’। অংশগ্রহণ করেছিলেন কণিষ্ক ভট্টাচার্য, শমীক ঘোষ, অদিতি বসু রায়, তানিয়া চক্রবর্তী ও শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী। বিতর্ক ছাড়াও তিন দিনের উৎসবে আয়োজিত হয়েছিল তিনটি আলোচনা। ‘আন্তর্জাতিক আঙিনায় পুরস্কার, অনুবাদ ও ভারতীয় কবিতা’–এই বিষয়টি নিয়ে আলোচকরা ছিলেন কন্নড় ভাষার কবি ও অনুবাদক কমলাকর ভাট, তামিল ভাষার কবি সবরিনাথন, ইংরেজি ভাষার কবি রাজর্ষি পত্রনবীশ এবং যশোধরা রায়চৌধুরী।
‘সংবাদ মূলত কাব্য’ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সভায় অংশ নিয়েছিলেন মৃদুল দাশগুপ্ত, বৈজয়ন্ত চক্রবর্তী, অনির্বাণ ভট্টাচার্য ও ভাস্কর লেট। কথা-সমন্বয়ে ছিলেন অভিমন্যু মাহাত। বাংলা ‘কবিতার বইয়ের বিপণন ও বাণিজ্য-বিস্তার এই বিষয়’ নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন শুভঙ্কর দে, পলাশ বর্মণ, সুদীপ্তা সর্বজ্ঞ, পার্থজিৎ চন্দ ও প্রসূন মজুমদার। বক্তা ও শ্রোতাদের অংশগ্রহণে প্রতিটি আলোচনা সভাই হয়ে উঠেছিল উপভোগ্য।
বাংলা ভাষার গুরুত্বপূর্ণ কবিরা ছাড়াও তিনদিনের এই উৎসবে কবিতা পড়েছেন ইংরেজি ভাষার কবি নিশি পুলুগুর্থা, মৈত্রেয়ী ভট্টাচার্য চৌধুরী, উর্দু ভাষার কবি আহমেদ মেরাজ ও ফৌযিয়া আখতার, হিন্দি ভাষার কবি মৃত্যুঞ্জয় সিং, বিমলেশ ত্রিপাঠী ও দিলীপ কুমার শর্মা ‘অজ্ঞাত’ প্রমুখ। উৎসবের তিনদিন বিভিন্ন সময়ে সংগীত পরিবেশন করেছেন সহেলী চৌধুরী, আত্রেয়ী চক্রবর্তী, রাতুল চন্দ্র রায়, শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী ও পৌলমী চট্টোপাধ্যায় বন্দোপাধ্যায়। রবীন্দ্রনাথ ও লালনের গানের পাশাপাশি গাওয়া হয়েছে কবিতার গান। উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ ছিল বিশিষ্ট বাচিক শিল্পীদের কণ্ঠে বাংলা ভাষার কয়েকজন প্রধান কবির কবিতাপাঠ। এই পর্বগুলিতে কবিতা পাঠ করেছেন বিজয়লক্ষী বর্মন, রত্না মিত্র, কৌশিক লাহিড়ী, সুদীপ্ত ভৌমিক, সৌমিত্র ঘোষ, আত্রেয়ী ভৌমিক প্রমুখ। পড়া হয়েছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, দেবারতি মিত্র, মল্লিকা সেনগুপ্ত, ভাস্কর চক্রবর্তী, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের কবিতা।
কনকনে ঠান্ডার মধ্যে কলকাতা শহরে এই তিনদিনের কবিতা উৎসব কবি এবং কবিতাপ্রেমীদের মধ্যে ভালোই উত্তাপ ছড়িয়েছিল। দু-টি কক্ষে একইসঙ্গে আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলিতে কবি এবং শ্রোতাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। উৎসবের আয়োজক সপ্তর্ষি প্রকাশনের সৌরভ মুখোপাধ্যায় জানান, “আগামী বছর এই উৎসব পঞ্চম বর্ষে পা দেবে। আরও বড়ো আকারে পঞ্চম বর্ষের উৎসব করার পরিকল্পনা রয়েছে”।