ভারতের আয় ও ব্যয়ের পরিসংখ্যানেও এই বৈষম্যের ইঙ্গিত মিলছে। আর্থিক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, মাসে প্রায় ৮০ হাজার টাকা আয় করলেই দেশের ধনীতম ১০ শতাংশের তালিকায় জায়গা পাওয়া সম্ভব। অর্থাৎ, দেশের অধিকাংশ মানুষের আয় এই সীমার নীচে। আয়করের নিয়মে নির্দিষ্ট শর্তে বছরে ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয়ে করের দায় না-থাকার বিষয়টিও এই আলোচনায় প্রাসঙ্গিক। তবে আয়কর ছাড়ের সীমা এবং দেশের ধনী-দরিদ্রের অবস্থান নির্ধারণের মাপকাঠি এক নয়।
ফাউন্ডেশন ফর ইকনমিক ডেভেলপমেন্টের প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট অহনা দত্তগুপ্ত সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি-কে জানিয়েছেন, এই তুলনা ভারতের অর্থনীতির একটি গভীর সমস্যার দিকে আঙুল তুলছে। সমস্যাটি শুধু দারিদ্র নয়, বরং গোটা অর্থব্যবস্থায় কম আয়ের ব্যাপক উপস্থিতি। তাঁর বক্তব্য, ভারতে যে পরিমাণ অর্থ খরচ করলে কাউকে ধনীতম ১০ শতাংশের মধ্যে ধরা যায়, আমেরিকা, কানাডা কিংবা ইউরোপের একাধিক দেশে সেই ব্যয়ের পরিমাণই কাউকে দরিদ্রতম ১০ শতাংশের মধ্যে ফেলতে পারে।
উন্নত দেশগুলিতে ধনী হওয়ার জন্য ব্যয়ের মাত্রা যে কতটা বেশি, পরিসংখ্যানেও তার ইঙ্গিত রয়েছে। আমেরিকায় ধনীতম ১০ শতাংশের অন্তর্ভুক্ত হতে দৈনিক ব্যয় করতে হয় প্রায় ১৭৩ ডলার। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় এই পরিমাণ যথাক্রমে প্রায় ১২৯ ডলার এবং জার্মানিতে ১২৮ ডলার। ফলে ভারতের ধনী পরিবারের ব্যয়ের সঙ্গে ওই দেশগুলির ধনী পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যবধান যথেষ্ট বড়।
অহনা দত্তগুপ্তের মতে, দেশের দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু শুধু দারিদ্র কমালেই সামগ্রিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত হয় না। দরিদ্র পরিবারগুলির আয় ও জীবনযাত্রার মান দেশের তুলনায় সচ্ছল পরিবারগুলির স্তরে পৌঁছলেও উন্নত দেশগুলির সঙ্গে ব্যবধান থেকে যেতে পারে। তাই শুধু ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে আয়ের ফারাক কমানোর বদলে গোটা অর্থনীতিতে আয় এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।
ভারতে দারিদ্র কমার দাবি অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দাবি করেছিলেন, তাঁর দশ বছরের শাসনকালে প্রায় ২৫ কোটি মানুষ দারিদ্রের কবল থেকে বেরিয়ে এসেছেন। গত বছর প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য শমিকা রবিও দাবি করেছিলেন, মোদী সরকারের আমলে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ দারিদ্র থেকে মুক্ত হয়েছেন। তবে দারিদ্রের হার কমা এবং দেশের মানুষের সামগ্রিক আয় ও জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়া এক বিষয় নয়। বিশ্বব্যাঙ্কের তথ্যকে ঘিরে সেই পার্থক্যই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
অহনার মতে, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই পরিমাণ জমি, পুঁজি ও শ্রম ব্যবহার করে আরও বেশি উৎপাদন করা সম্ভব হলে আয় বাড়বে এবং উচ্চ আয়ের কাজের সুযোগ তৈরি হবে। সেই লক্ষ্যে উদ্ভাবন, ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণের অনুকূল পরিবেশ এবং যুক্তিসঙ্গত করকাঠামো প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু দারিদ্র কমানো নয়, বরং বিপুল সংখ্যক মানুষের আয় বাড়ানো এবং উন্নত দেশগুলির সঙ্গে জীবনযাত্রার মানের ব্যবধান কমানো। বিশ্বব্যাঙ্কের রিপোর্ট ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে সেই বৃহত্তর প্রশ্নই—দারিদ্র থেকে মুক্তির পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক সমৃদ্ধি কতটা বাড়ছে।