ট্রাম্প-শি বৈঠকের দিকে নজর ওয়াল স্ট্রিটের, শুল্ক-সমঝোতা নিয়ে আশায় বাজার

বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির সম্পর্কের বরফ গলবে কি না, তার ইঙ্গিত পেতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আসন্ন বৈঠকের দিকে তাকিয়ে রয়েছে ওয়াল স্ট্রিট। বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিরল খনিজ এবং তাইওয়ান—এই চারটি বিষয় বৈঠকের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ওয়াশিংটনে শুরু হচ্ছে শি জিনপিংয়ের সফর। এক দশকের মধ্যে এটাই তাঁর প্রথম মার্কিন রাষ্ট্রীয় সফর।

আর্থিক বাজারের কাছেও এই বৈঠকের গুরুত্ব যথেষ্ট। কারণ, বর্তমানে কার্যকর মার্কিন-চিন শুল্ক-সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ১০ নভেম্বর। ফলে সমঝোতা আরও কিছুটা সময় বাড়ানো হবে কি না, সে দিকে বিশেষ নজর থাকবে বিনিয়োগকারীদের। দুই দেশ বাণিজ্যিক প্রতিশ্রুতি এবং কৌশলগত খনিজ সরবরাহ নিয়ে এখনও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বিরল খনিজ। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রক্রিয়াকরণে চিনের আধিপত্য রয়েছে। অন্য দিকে, সরবরাহের নিশ্চয়তা চাইছে ওয়াশিংটন। বর্তমান সমঝোতার আওতায় বিরল খনিজ সরবরাহ নিয়ে চিনের প্রতিশ্রুতি কতটা দ্রুত বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মার্কিন আধিকারিকেরা।


কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। উন্নত প্রযুক্তি এবং অর্ধপরিবাহী ক্ষেত্রে দুই দেশের প্রতিযোগিতা তীব্র থাকলেও সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে পারস্পরিক আলোচনার পথ তৈরি হয়েছে।

এই ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও মঙ্গলবার মার্কিন শেয়ারবাজারের প্রধান সূচকগুলি প্রায় রেকর্ড উচ্চতার কাছাকাছি ছিল। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও ন্যাসডাক কম্পোজিট ০.৫ শতাংশ বেড়ে নতুন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছয়। অন্য দিকে, ডাও জোন্স শিল্প সূচক ০.৪ শতাংশ কমে।

তেলের দামও কিছুটা কমেছে। গত সপ্তাহে প্রায় ১১০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছনোর পর ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপিছু ১০০ ডলারের নীচে নেমেছে। যদিও মার্কিন-ইরান সংঘাতের আগে প্রায় ৭২ ডলারের যে স্তর ছিল, তার তুলনায় এখনও দাম যথেষ্ট বেশি।

জিওজিত ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ ভি কে বিজয়কুমারের মতে, শি জিনপিংয়ের সফর থেকে ইতিবাচক ফল আসতে পারে, যা আর্থিক বাজারের পক্ষেও স্বস্তিদায়ক হবে। তাঁর বক্তব্য, নভেম্বরে শেষ হতে চলা স্বল্পমেয়াদি মার্কিন-চিন বাণিজ্য সমঝোতা নবীকরণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিজয়কুমার আরও বলেন, রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল আমদানির কারণে চিনা পণ্যের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক বসানোর হুমকি কার্যকর হলে চিনও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। তাতে দুই দেশেরই ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি মার্কিন রাজনীতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে বলে তাঁর মত।

ভেস্টেডের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী বিরাম শাহের মতে, বাজার ইতিমধ্যেই বর্তমান বাণিজ্যিক সমঝোতা বাড়ানোর সম্ভাবনাকে অনেকটাই হিসাবের মধ্যে রেখেছে। তাঁর বক্তব্য, এখন মূল প্রশ্ন হল—সমঝোতার মেয়াদ কতটা বাড়ানো হবে।

ওয়াশিংটন তিন থেকে ছয় মাসের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানান শাহ। তাঁর মতে, স্বল্পমেয়াদি বৃদ্ধি হলে তা কার্যত চিনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পর্যালোচনার সময়সীমা বাড়াবে এবং শুল্ক সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা ২০২৭ সালের শুরু পর্যন্ত গড়াতে পারে। এক বছরের মেয়াদের সমঝোতা হলে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি স্পষ্ট বার্তা যাবে।

তাঁর মতে, এই বৈঠকের প্রভাব মার্কিন বাজারে বিশেষ করে অর্ধপরিবাহী, হার্ডওয়্যার এবং শিল্পক্ষেত্রের সংস্থাগুলির উপর বেশি পড়তে পারে। তবে ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য এই বৈঠককে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কৌশলের পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি বাজার-ঘটনা হিসেবেই দেখা উচিত বলে মনে করেন শাহ। তাঁর মতে, আগামী এক বছরে মার্কিন শেয়ারবাজারে সুদের হার, তেলের দাম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর সংস্থাগুলির আয় আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হয়ে থাকবে।