অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু মধ্যপ্রাচ্য, বিশ্বজুড়ে অয়েল এফেক্টে জেরবার শেয়ার বাজার

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

পার্থ প্রতীম চট্টোপাধ্যায়

বেশ কিছুদিন ধরেই চলছিল যুদ্ধের প্রস্তুতি। অবশেষে ইজরাইল এবং আমেরিকা একজোট হয়ে ইরান আক্রমণ করল। প্রত্যাঘাত এসেছে ইরান থেকেও। কেবল এই যুদ্ধ আর এই তিনটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই তা ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশগুলিতে। ইরানি হানায় পশ্চিম এশিয়ার অনেক দেশ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার যে সমস্ত দেশ আমেরিকাকে যুদ্ধের জন্য রসদ জুগিয়েছে সেই সমস্ত দেশেই আছড়ে পড়েছে ইরানি মিসাইল কিংবা ড্রোন। ইরানের সর্বোচ্চ শাসক খামেনির মৃত্যুর পর আরও তীব্র হয়েছে ইরানের আক্রমণ। ইরানের দাবি— তারাও যোগ্য প্রত্যুত্তর দিচ্ছে। যেমন পশ্চিম এশিয়ার অবস্থা তেমনই ভারতের দুই প্রতিবেশী পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের মধ্যে যুদ্ধে ব্যাহত শান্তি প্রক্রিয়া।

প্রশ্ন ওঠে, এই যুদ্ধের ফলে ভারতীয় অর্থনীতির উপর কতটা প্রভাব পড়বে এবং এর ফলে বাজারের পতন হতে পারে কিনা? প্রথমত, এই যুদ্ধের সরাসরি খুব বেশি প্রভাব পড়বে না ভারতের অর্থনীতির উপর বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যুদ্ধে লিপ্ত দেশগুলির সঙ্গে কিছুটা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সম্পর্ক থাকলেও তার খুব বেশি প্রভাব পড়বে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন না৷ প্রভাব আসতে পারে অপরিশোধিত তেলের জোগানের উপর। গ্যাসের জোগান পর্যাপ্ত না হওয়ার জন্য আকাশ ছোঁয়া হতে পারে গ্যাসের দাম। ফলে আমজনতার রান্নাঘরেও যুদ্ধের আঁচ পড়তে বাধ্য। এক ডলার অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে ভারতের ইমপোর্ট বিল প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা বেড়ে যায়। ফলে ফিসকাল ডেফিসিট এর পরিমাণ বাড়তে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের ভু-রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার ফলে তেলের দাম ছুঁয়েছে ব্যারেল পিছু প্রায় ৯০ ডলারের কাছাকাছি। ভারত যেহেতু তেল আমদানিকারী দেশ তাই তেলের দামের এত বড় উত্থান ফিসক্যাল ডেফিসিট বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এক ডলার অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে ভারতের ইমপোর্ট বিল প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা বেড়ে যায়। ফলে ফিসকাল ডেফিসিটের পরিমাণ বাড়তে থাকে।


এছাড়াও তেলের দাম বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে ফলে সাধারণ মানুষের যেমন পকেটে টান পড়ে তেমনি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হয়। মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার ফলে বাড়তে পারে সুদের হার অথবা সিআরআর বা ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও। ফলে অর্থনীতিতে অর্থের জোগান কমে যাবে বেশ কিছুটা, আর্থিক বৃদ্ধির হার সাময়িকভাবে থমকে যেতে পারে। ফলে সমস্ত সেক্টরের সূচকের এবং সেনসেক্স ও নিফটির পতন হতে পারে। এই পতন আর তীব্রতর হবে মিডক্যাপ এবং স্মল ক্যাপ ইনডেক্স এবং শেয়ারগুলির ওপর। তবে দেখার বিষয় যুদ্ধের মেয়াদ থাকে কতদিন। যুদ্ধ স্বল্প সময়ের মধ্যে থেমে গেলে যুদ্ধের প্রভাব ভারত তথা বিশ্ব অর্থনীতির উপর খুব বেশি পড়বে না। সেক্ষেত্রে বাজার সাময়িকভাবে উপরে যাবার পথ পরিষ্কার করে নেবে। যুদ্ধের মেয়াদ দীর্ঘস্থায়ী হলে আর যাই হোক না কেনো বাজার থাকবে মুখ ফিরিয়ে। সেক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীকে দিতে হবে ধৈর্যের পরীক্ষা । তবে অনেক সমর বিশেষজ্ঞ মনে করছেন এই যুদ্ধের পরিণতি কেবল সময়ের অপেক্ষা আর যুদ্ধের মেয়াদও হবে অল্প।

ভারত তেল আমদানি নিয়ে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। অন্যান্য অনেক দেশ থেকেই তেল আমদানি করছে ,কিন্তু হরমুজ প্রণালী সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার জন্য ভারত তথা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তেলের যোগানের উপর প্রভাব আসবে, তাছাড়া হরমুজ প্রণালী ইরান সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার জন্য পশ্চিম এশিয়া থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা দিয়ে ঘুরপথে তেল পৌঁছবে ভারতে, যার ফলে ট্রান্সপোর্টেশন কস্ট এক লাফে বেড়ে যাবে প্রায় ৬০%-এর মত বলে অনুমান করছেন বিশেষজ্ঞরা। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে প্রাকৃতিক গ্যাসের জোগানের উপর যার ফলে ন্যাচারাল গ্যাসের দাম বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিনিয়োগের দিক থেকে বলতে গেলে এস আই পি বা সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান অবশ্যই চালু রাখবেন। STP বা সিস্টেমেটিক ট্রান্সফার প্ল্যানের মাধ্যমে এককালীন বিনিয়োগ করা শ্রেয় । কোনভাবেই নিজের বিনিয়োগ নিয়ে বিব্রত হবেন না। এই পরিস্থিতিতে আপনাকে দিতে হবে ধৈর্যের পরীক্ষা। বাজার পড়ার ফলে ভয় পেয়ে বা বিব্রত হয়ে আপনি বিনিয়োগ উঠিয়ে নিলে কিংবা এসআইপি বন্ধ করে দিলে আখেরে ক্ষতি আপনারই। বাজারের ​অস্থিরতা বাড়ার জন্য ট্রেডারদের সর্বদা সজাগ থাকতে হবে। ওভার ট্রেডিং থেকে বিরত থাকা উচিত হবে এই সময়। মাল্টি অ্যাসেট ফান্ডকে বেছে নেবেন আপনার বিনিয়োগের ঘোড়া হিসেবে। যুদ্ধের আবহাওয়ায় বাড়তে পারে সোনা এবং রুপোর দামও৷ তাই এই দুই মূল্যবান ধাতুর উপর বিনিয়োগ বাড়াতে বলছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।