অবিশ্বাস্য নাটকীয় মোড়: পদত্যাগ করেছিলেন আচমকাই, এক মাস পরেই ফের টাটা সন্সের চেয়ারম্যান চন্দ্রশেখরন

N. Chandrasekaran, Chairman, Tata Sons (Image/@airindia.com)

আচমকাই ইস্তফা দিয়েছিলেন তিনি। জল্পনা, বোর্ডে মতবিরোধের জেরেই তাঁর সেই সিদ্ধান্ত। তৃতীয় দফায় আর দায়িত্ব নেবেন না বলেও মাসখানেক আগেই স্পষ্ট জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বৃহস্পতিবার মুম্বইয়ে টাটা সন্সের (Tata Sons) পরিচালন কমিটির বৈঠকের পর সেই সিদ্ধান্ত ১৮০ ডিগ্রি উলটে গেল। নটরাজন চন্দ্রশেখরনকে (N Chandrasekaran) ফের পাঁচ বছরের জন্য এগজিকিউটিভ চেয়ারম্যান পদে বহাল রাখল টাটা গোষ্ঠীর হোল্ডিং সংস্থা।

হঠাৎ ইউ-টার্ন কেন

গত মাসে চন্দ্রশেখরন নিজেই জানিয়েছিলেন, ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এ মেয়াদ শেষ হলে তিনি আর দায়িত্বে থাকতে চান না। কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, পর্ষদের এক সদস্য তাঁর মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাবে সায় দেননি। অথচ স্যর দোরাবজি টাটা ট্রাস্ট এবং স্যর রতন টাটা ট্রাস্ট, দু’টিই সর্বসম্মত ভাবে তাঁর মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। প্রায় ছ’মাস ধরে বিষয়টি ঝুলে থাকায় নেতৃত্বে স্পষ্টতার অভাব তৈরি হচ্ছিল বলেও দাবি করেছিলেন তিনি। বৃহস্পতিবারের বৈঠকে সেই জট কাটিয়ে ফের তাঁকেই দায়িত্বে ফেরানো হল।


রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাপ

এই সিদ্ধান্তের ঠিক কয়েক দিন আগেই রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI) টাটা সন্সের কোর ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি (CIC) তকমা প্রত্যাহারের আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। ফলে আপার লেয়ার এনবিএফসি (NBFC) অর্থাৎ, উচ্চ শ্রেণীর নন-ব্যাঙ্কিং ফিন্যানসিয়াল সংস্থা হিসেবে শেয়ার বাজারে বাধ্যতামূলক তালিকাভুক্তির পথে হাঁটতেই হচ্ছে সংস্থাকে। ২০২২ সালে আরবিআই টাটা সন্সকে আপার লেয়ার এনবিএফসি তালিকায় ফেলেছিল। তিন বছরের মধ্যে তালিকাভুক্তির নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও ঋণমুক্ত হওয়ার যুক্তিতে ছাড় চেয়েছিল টাটা সন্স। সেই আর্জি আরবিআই সম্প্রতি খারিজ করে দিয়েছে। সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবারের বৈঠকেই ষেয়ার বাজারে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।

টাটা ট্রাস্টের সঙ্গে টানাপড়েন

টাটা সন্সের ৬৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক টাটা ট্রাস্ট (Tata Trusts)। ট্রাস্টের চেয়ারম্যান নোয়েল টাটা দীর্ঘদিন ধরেই এই তালিকাভুক্তির বিরোধিতা করে আসছেন। কারণ তালিকাভুক্ত হলে ট্রাস্টের নিয়ন্ত্রণ কিছুটা হলেও কমে যাওয়ার আশঙ্কা। শোনা যাচ্ছে, চন্দ্রশেখরনের কাছ থেকে তালিকাভুক্তি না করার প্রতিশ্রুতিও চেয়েছিলেন নোয়েল। পাশাপাশি সংস্থার ঋণের বহর এবং টাটা ডিজিটাল, এয়ার ইন্ডিয়ার (Air India) মতো ব্যবসায় ক্ষতির প্রসঙ্গও তুলেছিলেন তিনি। উলটো দিকে, টাটা সন্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম শেয়ারহোল্ডার শাপুরজি পালোনজি গোষ্ঠীর (Shapoorji Pallonji Group) হাতে রয়েছে প্রায় ১৮.৪ শতাংশ অংশীদারি। ঋণের বোঝা কমাতে এবং নিজেদের অংশীদারির প্রকৃত মূল্য বাজারে প্রতিফলিত করতে তারা বরাবরই তালিকাভুক্তির পক্ষে সওয়াল করে এসেছে।

কে এই চন্দ্রশেখরন

তামিলনাড়ুর ছেলে চন্দ্রশেখরন ১৯৮৭ সালে টাটা গোষ্ঠীতে যোগ দেন। টিসিএসের (TCS) দায়িত্ব সামলে ২০১৭ সালে সাইরাস মিস্ত্রির (Cyrus Mistry) জায়গায় টাটা সন্সের চেয়ারম্যান হন তিনি। ২০২২ সালে দ্বিতীয় দফায় দায়িত্ব পান। এ বার তৃতীয় দফাতেও তাঁর উপরেই ভরসা রাখল পর্ষদ। বাজারও এই খবরে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। টাটা কেমিক্যালস, টাটা ইনভেস্টমেন্ট, টিসিএস এবং টাটা টেকনোলজিসের (Tata Technologies) শেয়ার দর এক লাফে অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে।

আগামী দিনে কী

নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা কাটলেও শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্তি নিয়ে জটিলতা এখনই মিটছে না। ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নতুন পাঁচ বছরের মেয়াদে চন্দ্রশেখরনকেই এই গোটা প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে দেখা যাবে। টাটা ট্রাস্ট এবং শাপুরজি পালোনজির মধ্যেকার মতপার্থক্য কী ভাবে মেটে, শেয়ার বাজারে টাটা সন্সের অভিষেক কবে হয়, সে দিকেই এখন নজর থাকবে গোটা শিল্পমহলের।