আমজনতার পকেটে ফের চাপ বাড়ার আশঙ্কা। এবার বাড়তে পারে নিত্যপ্রয়োজনীয় চিনি কেনার খরচ। চিনি শিল্পের দাবি মেনে ন্যূনতম বিক্রয়মূল্য বাড়ানো হলে প্রতি কেজি চিনির দাম ৬৫ টাকা থেকে বেড়ে ৭৬ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ, এক ধাক্কায় কেজিতে ১১ টাকা দাম বাড়ার আশঙ্কা। যদিও এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি কেন্দ্র।
চিনির ন্যূনতম বিক্রয়মূল্য বাড়ানোর দাবিতে সরব হয়েছে চিনি শিল্প। পাশাপাশি আখের দাম বাড়ানোর দাবিতে কর্নাটক ও মহারাষ্ট্রে আন্দোলন করছেন কৃষকরা। চিনি শিল্পের সমস্যাগুলি খতিয়ে দেখতে প্রাক্তন নীতি আয়োগের সদস্য রমেশ চন্দের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে কেন্দ্র। বেঙ্গালুরুতে কৃষকদের সঙ্গে আলোচনার পর মহারাষ্ট্রের পুণেতেও বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছে ওই কমিটি। সেখানে অল ইন্ডিয়া সুগার ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা নিজেদের দাবি জানিয়েছেন।
চিনি শিল্পের অন্যতম প্রধান দাবি, বর্তমানে প্রতি কুইন্টাল চিনির ন্যূনতম বিক্রয়মূল্য ৩,১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে অন্তত ৪,২০০ টাকা করা হোক। সংগঠনের চেয়ারম্যান প্রফুল ভিতলানির দাবি, কেজিপিছু চিনির ন্যূনতম বিক্রয়মূল্য ৩১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪২ টাকা করা প্রয়োজন। শিল্পমহলের বক্তব্য, প্রায় সাত বছর ধরে এই মূল্য অপরিবর্তিত রয়েছে। অথচ এই সময়ের মধ্যে উৎপাদন খরচ অনেকটাই বেড়েছে।
চিনি কলগুলির দাবি, বিদ্যুতের খরচ, শ্রমিকদের মজুরি এবং কারখানার রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দামে চিনি বিক্রি করতে গিয়ে আর্থিক সংকটের মুখে পড়ছে একাধিক মিল। এই পরিস্থিতিতে ন্যূনতম বিক্রয়মূল্য সংশোধন না হলে শিল্পের সমস্যা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আখের দামও বাড়িয়েছে কেন্দ্র
অন্যদিকে, আখ চাষিদের জন্য ২০২৬-২৭ মরসুমে ফেয়ার অ্যান্ড রেমুনারেটিভ প্রাইস বা এফআরপি বাড়িয়েছে কেন্দ্র। ১০.২৫ শতাংশ বেসিক রিকভারি রেটের ভিত্তিতে প্রতি কুইন্টাল আখের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৬৫ টাকা। তবে আখের দাম বাড়ানোর দাবিতে কর্নাটক ও মহারাষ্ট্রের কৃষকদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।
ইথানল প্রকল্পের ঋণ মেটানো নিয়েও উদ্বেগ
চিনি শিল্পের আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা ইথানল উৎপাদন। সরকারের জাতীয় ইথানল মিশনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের একাধিক চিনি কল ইথানল তৈরির জন্য ডিস্টিলারি প্রকল্প গড়ে তুলেছে। এর জন্য ব্যাঙ্ক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণও নিয়েছে তারা। কিন্তু আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং অসময়ে বৃষ্টির কারণে আখে সুক্রোজের পরিমাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আখে সুক্রোজের পরিমাণ কমলে ইথানল উৎপাদনও ধাক্কা খেতে পারে। ফলে ইথানল বিক্রি থেকে যে আয় করে ঋণের কিস্তি মেটানোর পরিকল্পনা করেছিল চিনি কলগুলি, তা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইথানল প্রকল্পের ঋণ পরিশোধে দুই বছরের স্থগিতাদেশ বা মরাটোরিয়াম চেয়েছে শিল্পমহল। তাদের প্রস্তাব, এই দুই বছর ঋণের আসল এবং সুদ—কোনওটিই পরিশোধ করতে হবে না চিনি কলগুলিকে।
পাশাপাশি ইথানল প্রকল্পের ঋণে সরকারি সুদের ভর্তুকি বাড়ানোর দাবিও উঠেছে। বর্তমানে ঋণের সুদের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়া হয়। সেই ভর্তুকি বাড়িয়ে ১০০ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংগঠন।
কতটা বাড়বে সাধারণ মানুষের খরচ?
চিনি শিল্পের দাবি মেনে ন্যূনতম বিক্রয়মূল্য কেজিপিছু ৩১ টাকা থেকে ৪২ টাকা করা হলে খুচরো বাজারেও চিনির দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে বর্তমানে প্রতি কেজি প্রায় ৬৫ টাকার চিনি বেড়ে ৭৬ টাকা হতে পারে বলে আশঙ্কা। শুধু সরাসরি চিনি কেনার খরচই নয়, চায়ের দোকান থেকে মিষ্টি, বিস্কুট-সহ চিনিনির্ভর বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের পকেটে কতটা চাপ পড়বে, তা নির্ভর করছে কেন্দ্রের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের উপর।