সেনসেক্স ৯০০ পয়েন্ট নীচে, নিফটি ২৩ হাজারের তলায়: রক্তাক্ত বাজারে একদিনেই ডুবে গেল ৭ লক্ষ ৪০ হাজার কোটি টাকা

Stock Market Crash Today Highlights: All Sectors In Red (Image: Pexels/@Paul Espinoza)

সোমবার দালাল স্ট্রিটে ফের রক্তক্ষরণ। সপ্তাহের প্রথম দিনই একটা সময়ে সেনসেক্স (Sensex) নেমে গিয়েছিল ৭২,৯৯৫-এ। ক্ষতি প্রায় ৯০০ পয়েন্ট, অর্থাৎ ১.২১ শতাংশ। নিফটি ৫০ (Nifty 50) হারিয়েছে ২৮৪ পয়েন্ট। আপাতত দেখাচ্ছে ২২,৮৫৬। ২৩ হাজারের যে একটা মানসিক জোরের জায়গা থাকে, সেই সীমার অনেকটাই পিছনে পড়ে গিয়েছে।

তবে এ শুধু একদিনের গল্প নয়। শেয়ার বাজার (Stock Market) আসলে টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রচণ্ড চাপে আছে। ভারতের অর্থনীতির পক্ষে তা মোটেই সুখবর নয়। বিনিয়োগকারীরা আপাতত ঝুঁকি নেবেন কিনা সে প্রশ্নও উঠছে।

বাজারে ঠিক কী ঘটল?


সব ক্ষেত্রেই চাপ দেখা গিয়েছে। মিডক্যাপ (Midcap) ও স্মলক্যাপ (Smallcap) সূচক পড়েছে প্রায় ১ শতাংশ করে। সেনসেক্সের তিরিশটি শেয়ারের মধ্যে একমাত্র টাটা স্টিল সবুজে ছিল। বেড়েছে ০.৩৫ শতাংশ।

গত সপ্তাহেও সূচক লাল দাগেই শেষ করেছে। এটা টানা সপ্তম সপ্তাহের পতন। ২০২০ সালের পর এত ধারাবাহিক রক্তক্ষরণ আর দেখা যায়নি।

তেলের আগুনে পুড়ছে বাজার

এই রক্তপাতের সবচেয়ে বড় কারণ অপরিশোধিত তেল। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম (Brent Crude) ফের উঠেছে ১০৬ ডলারের কাছে। ভারতীয় মুদ্রায় প্রতি ব্যারেল প্রায় ১০,১৭০ টাকা। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরেই দাম বেড়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ।

এর পিছনে রয়েছে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত। ফেব্রুয়ারির শেষে আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলার পর থেকে হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) প্রায় অচল। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ওই পথ দিয়েই যায়। এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। কিন্তু জুলাইয়ে অন্তর্বর্তী সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর পরিস্থিতি ফের প্রতিকূল হয়েছে। সেপ্টেম্বরের গোড়ায় মার্কিন ও ইরানি বাহিনী পরস্পরের তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে।

জেনে রাখা ভালো, ভারত দেশীয় বাজারের জন্য প্রয়োজনীয় তেলের বড় অংশই আমদানি করে। তাই দাম চড়লে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ে। মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) বাড়ে। কোম্পানির মুনাফায় কামড় পড়ে। টাকাও দুর্বল হয়।

মার্কিন ট্রেজারি ইল্ড ভয় ধরাচ্ছে

দ্বিতীয় বড় চাপ আসছে আমেরিকা থেকে। আমেরিকার ১০ বছরের ট্রেজারি ইল্ড (US Treasury Yield) উঠেছে প্রায় ৫.২ শতাংশে। সর্বোচ্চ স্তরের কাছাকাছি।

হিসেবটা সহজ। আমেরিকার সরকারি বন্ডে ঝুঁকি কম, অথচ সুদ বেশি। চাই সেখানে টাকা লাগানোর প্রবণতা বেড়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি নিয়ে ভারতের মতো উদীয়মান বাজারে টাকা রাখবেনই বা কেন! তেলের দাম আর মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কায় তাই মির্কিন বন্ড বাজারেও বিক্রি ফিরেছে। এই সপ্তাহে মার্কিন মুদ্রাস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের তথ্যও আসবে। ফেডারেল রিজার্ভের সুদের পথ নিয়ে নতুন ইঙ্গিত মিলতে পারে। ফলে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে ভারতের বাজারেও। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন করে টাকা তো লাগাচ্ছেনই না উল্টে তাঁদের কাছে থাকা শেয়ার বেচে টাকা তুলে নিচ্ছেন।

বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাজার ছেড়ে যাচ্ছেন

অঙ্কটা সেরকমই বলছে। বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা (FPI) জুলাই ও আগস্টে কিছুটা কেনাকাটা করেছিলেন। সেপ্টেম্বরে তাঁরা আর কিনছেন না, বেচছেন। এ মাসে এখনও পর্যন্ত নিট বিক্রি ১৭,১৩১ কোটি টাকা। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত মোট বিক্রি প্রায় ২.৪ লক্ষ কোটি টাকা। অথচ গোটা ২০২৫ সাল ধরলে এই অঙ্ক ছিল ১.৬৬ লক্ষ কোটি।

এর সঙ্গে জুড়েছে টাকার পতন। ডলারের বিপরীতে টাকা (Indian Rupee) ঘোরাফেরা করছে ৯৬-এর কাছাকাছি। কোনও বিদেশি ফান্ডের কাছে সূচক স্থির থাকলেও টাকা পড়লে সেটা লোকসান। তাই তাঁদের হাত গুটিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

স্বস্তির দিকও অবশ্য আছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলি (DII) সেপ্টেম্বরের ২৫ তারিখ পর্যন্ত শেয়ারে বিনিয়োগ করেছে প্রায় ৫২,৬১৭ কোটি টাকা। বিদেশিরা যা বিক্রি করেছেন, তার প্রায় তিন গুণ। ফলে পতনটা আরও গভীর হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

জিওজিত ইনভেস্টমেন্টসের চিফ ইনভেস্টমেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট ড. ভি কে বিজয়কুমারের মতে, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আর মার্কিন ইল্ড এখন বাজারের সবচেয়ে বড় বাধা। বিদেশিরা চাঁদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করাও কমাচ্ছেন না। তাই তাঁর আশঙ্কা, স্বল্পমেয়াদে চাপ থাকবেই।

কোটাক সিকিউরিটিজের ইক্যুইটি রিসার্চ প্রধান শ্রীকান্ত চৌহান প্রযুক্তিগত স্তরের কথা বলেছেন। তাঁর হিসেবে নিফটির প্রথম সাপোর্ট (Support) ২২,৮০০, তারপর ২২,৬০০। সেনসেক্সের ক্ষেত্রে ৭৩,২০০ ও ৭২,৫০০। ঘুরে দাঁড়াতে গেলে নিফটিকে ২৩,২০০ থেকে ২৩,৩০০… এই রেঞ্জে ফিরে আসতেই হবে। সেনসেক্সের ক্ষেত্রে সেটা ৭৪,২০০ থেকে ৭৪,৫০০।

কী নজরে রাখবেন এবার?

চারটি জিনিস। ব্রেন্টের দাম ১০০ ডলারের নীচে নামছে কি না। টাকার দাম ৯৬ থেকে আরও বাড়ছে কি না। হরমুজ নিয়ে কূটনৈতিক অগ্রগতি আছে কি না। আর মার্কিন অর্থনীতির নতুন তথ্য কী বলবে।

বাংলায় আঁচ কতটা?

শেয়ার বাজার না বুঝলেও এই ঝড়ের ছোঁয়া আপনার রান্নাঘরে পৌঁছতে পারে। মে মাসের মাঝামাঝি থেকে পেট্রল-ডিজেলের দাম লিটারে প্রায় ৭.৫০ টাকা বেড়েছে। ক্রিসিলের রিপোর্ট অনুযায়ী, এর প্রভাব পড়েছে পরিবহণ ও উৎপাদন খরচে। পরিবহণ সংস্থাগুলি জানিয়েছে, মালবাহী গাড়ির ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৩ শতাংশ।

ডিজেলের দাম বাড়লে সাধারণত সবজি, মাছ, আলুর মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামেও ছোঁয়া লাগে। কলকাতা ও জেলার বাজারে চোখ রাখলেই সেই আঁচ টের পাওয়া যাচ্ছে।

কোটাক সিকিউরিটিজের অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশঙ্কা, তেল ১০০ ডলারের ওপরে থাকলে খুচরো মুদ্রাস্ফীতি ৬ শতাংশের দিকে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে রিজার্ভ ব্যাংক (RBI) সুদ ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়াতে পারে বলে তাঁর অনুমান। তাহলে গৃহঋণ ও গাড়িঋণের কিস্তিতেও টান পড়বে।

(এটি তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন, বিনিয়োগের পরামর্শ নয়। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ। সিদ্ধান্তের আগে নিজের আর্থিক পরামর্শদাতার সঙ্গে কথা বলুন। বিষয়টি দ্রুত বদলাচ্ছে, তাই পরিস্থিতি বদলালে তথ্যও বদলাতে পারে।)