১৫.১৫ লক্ষ কোটির গরমিল

ভারতের স্বর্ণ ব্যবসার জগতে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত নাম রাজেশ এক্সপোর্টস। বেঙ্গালুরু-ভিত্তিক এই সংস্থা একসময় দেশের অন্যতম সফল রফতানিকারক হিসেবে পরিচিত ছিল। সোনা পরিশোধন, গয়না উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানির মাধ্যমে সংস্থাটি ভারতের বৃহত্তম তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলির মধ্যে স্থান করে নিয়েছিল। কিন্তু এবার সেই সংস্থাকেই ঘিরে বড়সড় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে।

বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি (SEBI) ৩ জুন একটি অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ জারি করে রাজেশ এক্সপোর্টস এবং সংস্থার প্রোমোটার-চেয়ারম্যান রাজেশ মেহতার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। আপাতত তাঁদের শেয়ারবাজারে অংশগ্রহণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সেবির অভিযোগ, সংস্থাটি টানা পাঁচটি অর্থবর্ষে আর্থিক হিসাবপত্রে ব্যাপক কারচুপি করেছে। তদন্তে উঠে এসেছে, প্রায় ১৫.১৫ লক্ষ কোটি টাকার ঘোষিত আয়ের হিসাব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার দাবি, এই অঙ্ক এতটাই বিশাল যে তা বিশ্বের বহু দেশের বার্ষিক জিডিপিকেও ছাড়িয়ে যায়।

তবে এখনও তদন্ত শেষ হয়নি এবং সেবির এই নির্দেশ চূড়ান্ত নয়। রাজেশ এক্সপোর্টস ও রাজেশ মেহতার কাছে অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অভিযোগগুলি প্রমাণিত হলে সংস্থার বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের জরিমানা, বেআইনি মুনাফা বাজেয়াপ্তকরণ, দীর্ঘমেয়াদি বাজার নিষেধাজ্ঞাসহ একাধিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।


এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হল সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ। কারণ রাজেশ এক্সপোর্টসের অন্যতম বৃহৎ শেয়ারহোল্ডার হল রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বিমা সংস্থা এলআইসি। সংস্থাটির প্রায় ১০.৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে এলআইসির হাতে। যেহেতু এলআইসির মূল তহবিল সাধারণ মানুষের প্রিমিয়ামের অর্থ থেকে গঠিত হয়, তাই এই বিনিয়োগে বড় ক্ষতি হলে তার প্রভাব পরোক্ষভাবে লক্ষ লক্ষ পলিসিধারীর উপরও পড়তে পারে। সেবির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১২,৭২৬ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।

এই বিতর্কের সূত্রপাত ২০২৪ সালের মার্চ মাসে। তখন সেবির কাছে সংস্থার এক শেয়ারহোল্ডারের পক্ষ থেকে অভিযোগ জমা পড়ে। অভিযোগে বলা হয়, রাজেশ এক্সপোর্টসের বিপুল অঙ্কের বাণিজ্যিক পাওনা দীর্ঘ সময় ধরে আদায় হয়নি, যা আর্থিক অনিয়মের ইঙ্গিত দিতে পারে। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে সেবি। পরে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল নিয়োগ করা হয় এবং আর্থিক নথিপত্র খতিয়ে দেখতে ফরেনসিক অডিট সংস্থা বিডিও-কে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

তদন্ত এখনও চলছে। তবে এই ঘটনায় কর্পোরেট স্বচ্ছতা, নিরীক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে দেশের আর্থিক মহলে।