মঙ্গলবার সকালেই বড়সড় ধাক্কা খেল ভারতীয় টাকা। রিজার্ভ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে টাকার যে সাময়িক স্বস্তি মিলেছিল, তা কার্যত মুছে গিয়েছে একদিনেই। মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার দাম নেমে গিয়েছে ৯৬-এর ঘরে, যা গত কয়েক সপ্তাহে সবচেয়ে খারাপ অবস্থান।
কেন হঠাৎ এই পতন
সোমবার ৯৫.৬২ টাকায় বন্ধ হওয়ার পর মঙ্গলবার বাজার খোলার সময়েই টাকা দুর্বল হয়ে পড়ে। নেমে যায় ৯৬.১৬ থেকে ৯৬.১৭ পর্যন্ত, অর্থাৎ একদিনেই প্রায় আধ শতাংশ পতন। এর নেপথ্যে মূল কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যাওয়া। ব্রেন্ট ক্রুড (Brent Crude) এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে ব্যারেল প্রতি প্রায় ৮৫ মার্কিন ডলারে (INR হিসেবে যা প্রায় ৭,০৮০ টাকা) পৌঁছে গিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ফের সামরিক উত্তেজনা বাড়ায় এই মূল্যবৃদ্ধি। পশ্চিম এশিয়ায় পরপর তিন রাত মার্কিন হামলার খবরে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার জেরে যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও দানা বাঁধছে। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত তেল পরিবহন পথ স্ট্রেট অফ হরমুজ (Strait of Hormuz) দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের আশঙ্কাতেও জ্বালানির দাম চড়েছে।
ডলারের জোর
শুধু তেল নয়, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের (Federal Reserve) এক আধিকারিকের কড়া মন্তব্যে মার্কিন বন্ড ইল্ড বেড়ে যাওয়াও টাকার উপর চাপ বাড়িয়েছে। বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা দেখা দিলেই লগ্নিকারীরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ডলারের দিকে ঝুঁকছেন, যার ফলে ডলার সূচক (Dollar Index) শক্তিশালী হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের (FPI) ভারতের বাজার থেকে ক্রমাগত অর্থ প্রত্যাহারের প্রবণতা, যা টাকার উপর আলাদা করে চাপ তৈরি করছে।
শেয়ার বাজারেও এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে। সেনসেক্স (Sensex) প্রায় দশমিক চার শতাংশ পড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭,২৯৪-এর কাছাকাছি, আর নিফটি (Nifty) নেমে এসেছে ২৪,১৪৪-এর ঘরে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, তেল আমদানিকারী সংস্থাগুলির বাড়তি ডলার চাহিদাই এই পতনের অন্যতম বড় কারণ, কারণ জ্বালানি আমদানির খরচ বাড়লে দেশের চলতি খাতে ঘাটতিও (Current Account Deficit) বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
রিজার্ভ ব্যাংকের চেষ্টা
গত কয়েক সপ্তাহে বিদেশি লগ্নি টানতে রিজার্ভ ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক নীতিগত পদক্ষেপে টাকা কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির চাপে সেই লাভের অনেকটাই এখন উবে গিয়েছে বলে মত বাজার বিশ্লেষকদের। আগামী দিনে টাকার গতিপথ নির্ভর করছে মূলত পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি, অপরিশোধিত তেলের দাম, মার্কিন ডলার সূচকের গতিবিধি এবং প্রয়োজনে রিজার্ভ ব্যাংকের হস্তক্ষেপের উপর।
পশ্চিমবঙ্গের বাজারে প্রভাব
টাকার এই পতনের আঁচ এসে পড়ছে খাস কলকাতাতেও। উৎসব মরসুম আসন্ন। এখনই বউবাজার ও গড়িয়াহাটের সোনার দোকানে কেনাকাটার ভিড় বাড়ার কথা, ঠিক তখনই ডলারের দাম বাড়লে আমদানি করা সোনার দামেও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া রাজ্যের যে সমস্ত ছোট ও মাঝারি শিল্প যন্ত্রাংশ বা কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করে, তাদের উৎপাদন খরচও বাড়ার আশঙ্কা থাকছে। জ্বালানির দাম চড়া থাকলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়তে পারে সাধারণ মানুষের পেট্রল-ডিজেলের খরচেও, যা পরোক্ষে বাজারদরে মূল্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত দিতে পারে।
আপাতত বাজারের নজর গোটাটাই পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির দিকে। ইরান পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তেলের দাম কমার সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনই উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে টাকার উপর চাপ আরও বাড়তে পারে বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদদের একাংশ।