সংখ্যাটা মনে রাখুন। ৩৯,৬৪০ কোটি টাকা। মানে প্রায় ৪.২ বিলিয়ন ডলার। শুধু জুন মাসেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢেলেছেন ভারতের সরকারি বন্ডে।
এক মাসে এতটা আগে কখনও হয়নি। এর আগের রেকর্ড ছিল ২০২৪ সালের আগস্টে, ২২,০০৫ কোটি টাকা। এবার সেটা প্রায় দ্বিগুণ ছাড়িয়ে গিয়েছে।
কিন্তু কেন? হঠাৎ কী এমন ঘটল?
আগে বুঝুন, সরকারি বন্ড জিনিসটা কী
ধরুন, সরকারের হাতে টাকার টান পড়েছে। রাস্তা বানাতে হবে, প্রতিরক্ষায় খরচ করতে হবে। সরকার তখন বাজার থেকে ধার নেয়। সেই ধারের একটা কাগজ দেয়, যেটার নাম সরকারি বন্ড বা G-Sec (Government Security)। এতে লেখা থাকে, কত সুদে, কত বছরে, ধার মেটানো হবে।
দেশের ব্যাংক, বিমা সংস্থা এতদিন এই বন্ড কিনত। এখন বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও কিনছেন। সুদ পাচ্ছেন, টাকা ফেরত পাচ্ছেন। ঝুঁকি কম, কারণ পরিশোধকারী স্বয়ং সরকার।
তা হলে এতদিন কেন বিদেশিরা কিনতেন না?
কারণ দুটো কাঁটা ছিল বিঁধে।
এক, ট্যাক্সের জ্বালা। সরকারি বন্ডে সুদ পেলে দিতে হত ২০ শতাংশ উইদহোল্ডিং ট্যাক্স। এক বছরের বেশি রেখে বিক্রি করলে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনী লাভের উপর ১২.৫ শতাংশ কর।
দুই, বিনিয়োগের সীমা। নানা বিধিনিষেধে আটকানো ছিল বাজার।
তারপর জুনে কী হল
৫ জুন, ২০২৬। RBI-এর মুদ্রানীতি ঘোষণার দিন। একসঙ্গে দুই দিক থেকে বোমা ফাটল।
প্রথমত, কেন্দ্রীয় সরকার অর্ডিন্যান্স জারি করল। সিদ্ধান্ত ঘোষিত হল, সরকারি বন্ডে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সুদ আয় এবং মূলধনী লাভ, দুটোতেই আয়করে সম্পূর্ণ ছাড়। কার্যকর হবে ১ এপ্রিল, ২০২৬ থেকে। মানে, এতদিন যে কর ছিল বাধা, সেটা উঠে গেল।
এই একটা সিদ্ধান্তই বাজারে তোলপাড় ফেলে দিল। বিশেষজ্ঞদের কথায়, ভারত ছিল বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি দেশের মধ্যে একটা যারা বিদেশিদের কাছ থেকে সরকারি ঋণপত্রের উপর কর নিত। সেই আপত্তি কার্যত শেষ হয়ে গেল।
দ্বিতীয়ত, RBI খুলে দিল FAR বা ফুলি অ্যাক্সেসিবল রুট নামের একটা পথ। এটা কী? ২০২০ সালে RBI চালু করেছিল FAR। এর মাধ্যমে বিদেশিরা নির্দিষ্ট কিছু সরকারি বন্ড কিনতে পারেন বিনা বাধায়, কোনও বিনিয়োগসীমা ছাড়াই। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হল ১৫ বছর, ৩০ বছর এবং ৪০ বছরের মেয়াদি সব নতুন বন্ড। মানে, বাজার আরও বড় হল।
তৃতীয়ত, সাধারণ পথেও বিনিয়োগে ছাড় দিল RBI। স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ সীমা, একক সংস্থার কেন্দ্রীভবন সীমা, এবং আলাদা আলাদা বন্ডে সীমা, এই তিন বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হল।
তেলের দাম আর টাকার চাপ
এর আরও একটা রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট আছে।
পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনার কারণে চড়চড় বাড়ছিল তেলের দাম। ব্রেন্ট ক্রুড উঠেছিল প্রায় $৯৫ প্রতি ব্যারেলে (প্রায় ৮,৯৩০ টাকা)। ভারত তেল আমদানি করে, তাই তেলের দাম বাড়লে ডলারের চাহিদা বাড়ে, টাকার উপর চাপ পড়ে। তার উপর শেয়ার বাজার থেকে বিদেশিরা টাকা তুলে নিচ্ছিলেন। এই দুই চাপে ভারতীয় মুদ্রা মে মাসে ডলার প্রতি ৯৬.৯৬ টাকার রেকর্ড নীচে নেমে গিয়েছিল।
সরকার ও RBI বুঝল, ভারতের বন্ড বাজারকে আকর্ষণীয় করতে পারলে বিদেশি মুদ্রা আসবে। টাকাও জোর পাবে। সিদ্ধান্তটা তাই কৌশলগতভাবেও জরুরি ছিল। এই লেখা লেখার সময় টাকার দাম ডলারের নিরিখে উঠে এসেছে ৯৪.৪০ টাকায়।
Bloomberg সূচক: আসল পুরস্কার
এই গোটা গল্পের সবচেয়ে বড় অধ্যায়টা আসলে শুরু হয়নি এখনও। সেটার নাম Bloomberg Global Aggregate Bond Index।
বিষয়টা বোঝা দরকার। শেয়ার বাজারে যেমন Sensex বা Nifty দেখে বোঝা যায় বাজার কেমন চলছে, বন্ড বাজারেও তেমন আন্তর্জাতিক সূচক আছে। Bloomberg Global Aggregate হল তার মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং বহুল-অনুসৃত। বিশ্বের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল (Sovereign Wealth Fund), পেনশন তহবিল, বিমা সংস্থা এই সূচক ধরে বিনিয়োগ করে। মানে, ভারত এই সূচকে ঢুকলে এই তহবিলগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ভারতীয় বন্ড কিনতে বাধ্য।
সমস্যা হল, Bloomberg জানুয়ারি ২০২৬-এ ভারতকে ঢুকতে দেয়নি। কারণ হিসেবে জানিয়েছিল, ভারতের বন্ড বাজারে লেনদেন নিষ্পত্তিতে দেরি, ট্যাক্স প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং ট্রেডিং অটোমেশনের অভাব। তবে বলেছিল, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি আবার পর্যালোচনা করা হবে।
সেই সময় এসে গিয়েছে। সরকার ও RBI এর আগেই কর ছাড়, FAR সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ সীমা শিথিলের মাধ্যমে Bloomberg-এর বেশিরভাগ আপত্তির জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছে। RBI গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা এমনকি ২৪ জুন বললেন, যা করার ছিল, কার্যত সবই হয়ে গিয়েছে।
বাজারের ব্যবসায়ীরাও তাই ছুটছেন। তাঁদের মনোভাব, Bloomberg সূচকে ভারত ঢুকলে কোটি কোটি ডলার আসবে, তাই এই আশায় এখনই জায়গা নিয়ে নেওয়া যাক। এই আগাম অবস্থান নেওয়াটাই বর্তমান রেকর্ড বিনিয়োগের বড় কারণ।
ভারতের বন্ড যাত্রা: ক্রমে বড় মঞ্চে
ভারত আগে বহু বড় সূচক থেকে দূরে ছিল। সেই ছবি পাল্টাচ্ছে ধাপে ধাপে। JPMorgan তার উদীয়মান বাজার সূচকে ভারতকে নিয়েছিল জুন ২০২৪ থেকে, সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ওজনে। Bloomberg-এর উদীয়মান বাজার সূচকে এসেছে জানুয়ারি ২০২৫-এ। FTSE Russell-এর সূচকে সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ। Bloomberg Global Aggregate সূচক হবে এই যাত্রার পরবর্তী এবং সবচেয়ে বড় মাইলফলক।
এই মুহূর্তে FAR বন্ডে বিদেশিদের মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩.৩২ লক্ষ কোটি টাকা। ভারতের বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার ১২ জুন পর্যন্ত ছিল $৬৭২ বিলিয়ন (প্রায় ৬৩.৩ লক্ষ কোটি টাকা)।
সাধারণ মানুষের কী এল গেল
সরাসরি না হলেও পরোক্ষ সম্পর্ক আছে।
বিদেশি মুদ্রা ঢুকলে টাকা শক্তিশালী হয়। টাকা শক্তিশালী হলে তেল আমদানির খরচ কমে। পেট্রোলের দামে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। পণ্যের পরিবহণ খরচ কমতে পারে। মুদ্রাস্ফীতিতে কিছুটা লাগাম লাগতে পারে।
বন্ডের চাহিদা বাড়লে সরকারি ঋণের সুদ কমে। ১০ বছরের বেঞ্চমার্ক সরকারি বন্ডের সুদ ইতিমধ্যে ঘোষণার পর প্রায় ২০ বেসিস পয়েন্ট কমে এসে থিতু হয়েছে ৬.৭৬ শতাংশে। সরকার সস্তায় ধার পেলে সেই সাশ্রয় পরিকাঠামো খরচে যেতে পারে।
একটাই সাবধানবাণী
তবে সবটাই যে এক্কেবারে দুরন্ত সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ এমন নয়। আমেরিকার ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার এখনও অনেকটাই চড়া। মানে ঝুঁকিহীন আমেরিকান বন্ডেই ভালো সুদ পাওয়া যাচ্ছে, তাই ভারতীয় বন্ড তুলনামূলকভাবে কম আকর্ষণীয় হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন বদলালে এই সব বিদেশি টাকা যেমন আসে, তেমন বেরিয়েও যেতে পারে। Bloomberg সূচকে না ঢুকলে এই উত্তেজনা সাময়িকও হতে পারে।
কিন্তু এই মুহূর্তে গল্পটা ভারতের পক্ষে খুবই আশার খবর। এক মাসে ৩৯,৬৪০ কোটি টাকার রেকর্ড সেটাই বলছে।