পশ্চিম এশিয়ার সংকট কাটছে না। ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সংঘাতের জেরে অশোধিত তেল বা ব্রেন্ট ক্রুডের দাম হু হু করে বাড়ছে। ফলে প্রবল চাপে দেশের তেল বিপণন সংস্থাগুলি। রেটিং সংস্থা ICRA-র হিসেব বলছে, পেট্রলে লিটারপ্রতি প্রায় ৫ টাকা এবং ডিজেলে ২৩ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলিকে। এই পরিস্থিতি আর বেশি দিন চললে জ্বালানির দামের ছ্যাঁকা লাগবে জনসাধারণের গায়েও। কারণ দিনের পর দিন এত মোটা অঙ্কের লোকসান তেল কোম্পানিগুলি নিজের ঘাড়ে বইবে না। এটাই বাজার অর্থনীতির সহজ অঙ্ক। যদিও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে কেন্দ্র দাম বাড়ানোর পথে না হাঁটতে চাইলে আলাদা কথা।
কেন হঠাৎ এই ধাক্কা
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও আমেরিকার (Iran-US) সংঘাত ফের মাথাচাড়া দেওয়ায় অশোধিত তেলের (crude oil) আন্তর্জাতিক বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। বিশ্ববাজারের নিরিখ ব্রেন্ট ক্রুডের (Brent crude) দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের গণ্ডি পেরিয়েছে। ভারতের আমদানি করা তেলের সূচক, ইন্ডিয়ান বাস্কেট ক্রুড (Indian basket crude), ছুঁয়েছে প্রায় ১০৯ ডলার, যা গত ২১ মে-র পর সর্বোচ্চ।
ICRA-র কর্পোরেট রেটিং বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রশান্ত বশিষ্ঠ (Prashant Vasisht) জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরের গড় দামের নিরিখে পেট্রলে বিপণন মার্জিন (marketing margin) নেমে গিয়েছে লিটারপ্রতি প্রায় মাইনাস ৫ টাকায়, ডিজেলে সেটাই মাইনাস ২৩ টাকা। রান্নার গ্যাসেও (LPG) সিলিন্ডারপিছু আন্ডার-রিকভারি (under-recovery) পৌঁছেছে প্রায় ২০০ টাকায়। অর্থাৎ, সোজা কথায় পেট্রলে প্রতি লিটারে ৫ টাকা বাড়তি ক্ষতি হচ্ছে, ডিজেলে সেটাই ২৩ টাকা। এমনকী রান্নার গ্যাসেও এই ক্ষতির পরিমাণ সিলিন্ডারপিছু ২০০ টাকা।
মিটছে না ঘাটতি
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও, দেশের পাম্পে পেট্রল-ডিজেলের দাম মে মাস থেকে কার্যত একই আছে। গত মে মাসেই, ভোট মিটে যাওয়ার ঠিক পর পরই চার দফায় পেট্রলের দাম লিটারপ্রতি ৭.৩৫ টাকা এবং ডিজেলের দাম ৭.৫৩ টাকা বাড়িয়েছিল সরকার। কিন্তু তার পরে অশোধিত তেলের দাম যে গতিতে বেড়েছে, তাতে সেই বৃদ্ধি যথেষ্ট হয়নি বলেই ইঙ্গিত ICRA-র রিপোর্টে।
তেল সংস্থাগুলি অবশ্য প্রকৃত আন্ডার-রিকভারির অঙ্ক নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে চায়নি। তবে এপ্রিল-মে মাসে সংঘাত যখন তুঙ্গে ছিল এবং ইন্ডিয়ান বাস্কেট ক্রুডের দাম ব্যারেলপিছু ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল, তখন প্রতিদিন ১,০০০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হচ্ছিল বলে শিল্পমহলের দাবি।
চাপ বাড়ছে
কলকাতায় বর্তমানে পেট্রলের দাম লিটারপ্রতি প্রায় ১১৩.৫১ টাকা এবং ডিজেলের দাম ৯৯.৮২ টাকা, যা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে অপরিবর্তিত। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তা হলে আগামী দিনে খুচরো বাজারেও দাম বাড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলেই মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে, যেখানে পণ্য পরিবহণ থেকে গণপরিবহণ, সবই জ্বালানির দামের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল, দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের বাজারেও। এমনিই বর্তমানে মূল্যবৃদ্ধির জেরে জেরবার মানুষ।
কী হতে পারে
ICRA-র সতর্কবার্তা বলছে, সংঘাতের এই আবহ আরও দীর্ঘ সময় ধরে চললে এবং দেশের বাজারে জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত থাকলে আন্ডার-রিকভারির অঙ্ক আরও বাড়তে পারে। চিনের মতো দেশ তেল আমদানি বাড়াচ্ছে বলেও রিপোর্টে উঠে এসেছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে তেল বিপণন সংস্থাগুলির আর্থিক স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা বাড়ছে বিশেষজ্ঞমহলে। সেক্ষেত্রে জ্বালানির দাম বাড়ানো ছাড়া গতি নেই বলেই আশঙ্কা অর্থনীতিবিদদের।