পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আবহ, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির অনিশ্চয়তা, ইউরোপে উষ্ণায়নের অভিঘাতে জ্বালানির সরবরাহ ব্যবস্থায় টানাপোড়েন। গোটা বিশ্বেই জ্বালানির নিরাপত্তা এখন অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয়। সেই অনিশ্চয়তার ছায়া পড়ছে ভারতেও। অশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের আমদানিনির্ভর অর্থনীতির সামনে বারবার তৈরি হচ্ছে নতুন চ্যালেঞ্জ। সেই প্রেক্ষাপটে পেট্রল-ডিজেলের বদলে বৈদ্যুতিক, সিএনজি এবং হাইব্রিড গাড়ির দিকে দ্রুত ঝুঁকছেন দেশের ক্রেতারা। গত কয়েক মাস ধরে দেশে বৈদ্যুতিক, সিএনজি-র মতো পেট্রল-ডিজেলের বিকল্প এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির গাড়ির বিক্রি আরও বেড়েছে।
সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে দেশের গাড়ি ডিলারদের সংগঠন ফাডা সর্বশেষ বিক্রির যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, বিকল্প জ্বালানির গাড়ির বাজারে একাধিক নজির গড়েছে ভারত। জুন মাসে প্রথমবার দেশের দু’চাকার গাড়ির বাজারে বৈদ্যুতিক যানবাহনের অংশীদারি ১০ শতাংশের গণ্ডি পেরিয়েছে। একই সঙ্গে যাত্রীবাহী গাড়ির বাজারে বৈদ্যুতিক, সিএনজি ও হাইব্রিড মিলিয়ে বিকল্প জ্বালানির গাড়ির অংশীদারি ৪০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ, বিক্রি হওয়া প্রতি ১০টি যাত্রীবাহী গাড়ির মধ্যে চারটিরও বেশি এখন বিকল্প জ্বালানিচালিত।
ভারতের মোট জীবাশ্ম জ্বালানির চাহিদার ৮০ শতাংশেরও বেশি আমদানির মাধ্যমে মেটাতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সামান্য অস্থিরতাও সরাসরি প্রভাব ফেলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার উপর। ইজরায়েল-ইরান-আমেরিকার সংঘাত কিংবা পশ্চিম এশিয়ার যে কোনও নতুন সঙ্কট বিশ্ববাজারে অশোধিত তেলের সরবরাহ ও দামের উপর চাপ তৈরি করে। তার সঙ্গে যদি যোগ হয় ডলারের তুলনায় টাকার দুর্বলতা, তবে আমদানি খরচ আরও বেড়ে যায়। এর প্রভাব শুধু তেল সংস্থাগুলির উপর পড়ে তা নয়। সরকারের আর্থিক ভারসাম্য এবং সাধারণ মানুষের ব্যয়ের উপরেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই কারণেই দীর্ঘমেয়াদে আমদানি-নির্ভরতা কমাতে বৈদ্যুতিক ও বিকল্প জ্বালানির গাড়িকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে কেন্দ্র।
ফাডার পরিসংখ্যান বলছে, জুন মাসে দেশে বিক্রি হওয়া মোট দু’চাকার গাড়ির ১০.৬০ শতাংশই ছিল বৈদ্যুতিক। ব্যবসার ভাষায় দুই অঙ্কের বৃদ্ধির সীমা বা ‘ডাবল ডিজিট’ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। সেই সীমা অতিক্রম করায় ইভি শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা আরও বেড়েছে। অন্যদিকে, যাত্রীবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক, সিএনজি এবং হাইব্রিড মিলিয়ে বিকল্প জ্বালানির অংশীদারি দাঁড়িয়েছে ৪০.৩৫ শতাংশে। একই সময়ে পেট্রলচালিত যাত্রীবাহী গাড়ির বাজারের অংশীদারি কমেছে প্রায় ২ শতাংশ। শিল্পমহলের মতে, জ্বালানির ব্যয়, পরিবেশ সচেতনতা এবং দীর্ঘমেয়াদে কম রক্ষণাবেক্ষণের খরচ-এই তিন কারণেই বিকল্প জ্বালানির গাড়ির প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে।
কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভা ভোটপর্ব শেষ হওয়ার পরে ১৫ মে থেকে চার দফায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে পেট্রল ও ডিজেলের দাম। আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে অশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির যুক্তিতে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল। বেড়েছে সিএনজির দামও। কিন্তু পরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অনেকটাই কমলেও দেশে খুচরো বাজারে পেট্রল-ডিজেলের দামে এখনও তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। সে কারণেই মানুষের বিকল্প জ্বালানির গাড়ির প্রতি ঝোঁক আরও বাড়ছে বলেই মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞেরা।
তবে শুধু বিকল্প জ্বালানিই নয়, দেশের গাড়ির বাজারও সামগ্রিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। ফাডার তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে দেশে মোট ২৫ লক্ষ ৫৭ হাজার ২৩৪টি গাড়ি বিক্রি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। এই বিক্রিই এখনও পর্যন্ত সর্বোচ্চ বলে দাবি সংগঠনের।
আগামী কয়েক মাসের সম্ভাবনা নিয়ে ডিলাররা আশাবাদী হলেও একটি বিষয় নিয়ে তারা এখনও সতর্ক রয়েছে। সেটা হল বর্ষার গতিপ্রকৃতি। জুন মাসে দেশের বহু এলাকায় বৃষ্টিপাত স্বাভাবিক ছিল না। বৃষ্টির ঘাটতির প্রভাব পড়ে মূলত গ্রামীণ বাজারে। কারণ বৃষ্টি কম হলে কৃষিকাজ মার খায়। ফলে যাঁরা কৃষি নির্ভর তাঁদের কেনাকাটা কিছুটা কমে। সে সকারণেই দু’চাকা ও যাত্রীবাহী গাড়ির বিক্রিতে কিছুটা চাপ দেখা দিয়েছে। তবে বিক্রেতাদের আশা, আগামী দিনে বর্ষা ঘাটতি পূরণ করতে পারলে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি ফিরবে। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে গাড়ির বাজারেও। সেক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানির গাড়ির ক্রমবর্ধমান চাহিদা তখন নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।