আমদানিতে পরিবর্তনের আভাস, ভারতে সস্তা ওয়াইন, বিস্কুট, চকোলেট

নিজস্ব গ্রাফিক্স চিত্র

ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সদ্য চূড়ান্ত হওয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) আগামী এক দশকে দেশের আমদানি বাজারে বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই চুক্তির ফলে ইউরোপ থেকে আসা গাড়ি, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক, ওষুধ, বিমান, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং খাদ্যপণ্যের উপর শুল্ক ধাপে ধাপে কমানো হবে। ফলে ভারতের বাজারে এই পণ্যগুলির দাম কমার পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের উপরও বড় প্রভাব পড়বে বলেই মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

প্রধানমন্ত্রী মোদী মঙ্গলবার জানিয়েছেন, ২৭টি দেশ নিয়ে গঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এই ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ফন ডার লেয়েন প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘ভারত ও ইইউ-এর মধ্যে ভরসাযোগ্য বন্ধুত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার নতুন অধ্যায় শুরু হল।’ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দাবি, এই চুক্তির ফলে ২০৩২ সালের মধ্যে ভারতে তাদের রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণ হবে এবং বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ইউরো শুল্ক সাশ্রয় হবে।

সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে চলেছে প্রিমিয়াম গাড়ির বাজারে। বর্তমানে ইউরোপ থেকে আমদানি হওয়া গাড়ির উপর কার্যকর শুল্ক প্রায় ৭০ শতাংশ। নতুন চুক্তি অনুযায়ী ধাপে ধাপে এই শুল্ক কমিয়ে ১০ শতাংশে নামানো হবে। তবে এই সুবিধা বছরে সর্বোচ্চ ২ লক্ষ ৫০ হাজার গাড়ির ক্ষেত্রেই কার্যকর হবে। ফলে ইউরোপীয় বিলাসবহুল গাড়ির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, যা দেশের প্রিমিয়াম অটো বাজারের কাঠামোই বদলে দিতে পারে।


যন্ত্রপাতি ও শিল্প উপকরণের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আসছে। বর্তমানে যন্ত্রপাতিতে সর্বোচ্চ শুল্ক যেখানে ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত, তা ধাপে ধাপে প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা হয়েছে। রাসায়নিক পণ্যের ক্ষেত্রে গড় শুল্ক ২২ শতাংশ থেকে প্রায় পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে। ওষুধ শিল্পেও বড় ছাড়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে—গড় শুল্ক ১১ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হবে, যার প্রভাব পড়বে দেশের ওষুধ শিল্প ও বাজারদরের উপর।

বিমান ও মহাকাশ সংক্রান্ত পণ্যের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইউরোপ থেকে আমদানি করা প্রায় সব ধরনের অসামরিক বিমান ও মহাকাশ উপকরণের উপর শুল্ক তুলে নেওয়া হবে। এর ফলে ভারতের অসামরিক বিমান পরিবহণ খাতে খরচ কমবে এবং এয়ারলাইন শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

চিকিৎসা ক্ষেত্রেও এই চুক্তির প্রভাব সুদূরপ্রসারী। অপটিক্যাল, মেডিক্যাল ও সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতির প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্যের উপর শুল্ক তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর ফলে হাসপাতাল পরিষেবা, ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা এবং চিকিৎসা খরচ তুলনামূলকভাবে কমতে পারে বলে আশাবাদী স্বাস্থ্যক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা।

খাদ্য ও পানীয় পণ্যের ক্ষেত্রেও শুল্ক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসছে। ওয়াইনের উপর শুল্ক ২০ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে নামানো হবে। স্পিরিটসের ক্ষেত্রে শুল্ক থাকবে ৪০ শতাংশ এবং বিয়ারের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ। অলিভ অয়েল, মার্জারিন এবং বিভিন্ন বনস্পতি তেলের উপর শুল্ক কমানো বা পুরোপুরি তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে এই পণ্যগুলি ভারতের বাজারে তুলনামূলকভাবে সস্তা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।

এছাড়াও আর্থিক পরিষেবা ও সামুদ্রিক পরিবহণ খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশেষ প্রবেশাধিকার পাচ্ছে। এই দুই ক্ষেত্রেই ভারত এতদিন তুলনামূলকভাবে সংরক্ষণশীল নীতি অনুসরণ করত। নতুন চুক্তির ফলে এই খাতগুলিতেও ইউরোপীয় সংস্থার উপস্থিতি বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।

চুক্তির অংশ হিসেবে ইউরোপ আগামী দু’বছরে ভারতের জন্য ৫০০ মিলিয়ন ইউরো আর্থিক সহায়তা দেবে। এই অর্থের মূল লক্ষ্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো, পরিবেশবান্ধব পরিকাঠামো গড়ে তোলা এবং পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা।

অন্যদিকে, এই চুক্তিকে ঘিরে দেশীয় শিল্পমহলে উদ্বেগও বাড়ছে। অটো, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক ও মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি শিল্পে ভারতের সংস্থাগুলির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, উৎপাদন খরচ কমানো, মানবসম্পদ দক্ষতা বৃদ্ধি এবং গবেষণায় বিনিয়োগ না বাড়ালে ইউরোপীয় পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।

সব মিলিয়ে, ভারত–ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি শুধু আন্তর্জাতিক কূটনীতি নয়, দেশের অর্থনীতি, শিল্পনীতি, বাজার কাঠামো এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের উপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে চলেছে। আগামী কয়েক বছরে এই চুক্তির বাস্তব প্রভাব কীভাবে দেশের বাজারে প্রতিফলিত হয়, সেদিকেই এখন নজর অর্থনীতিবিদ, শিল্পমহল এবং সাধারণ মানুষের।