ভারতের অর্থনীতির জন্য চলতি আর্থিক বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকের পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। নানা প্রতিকূলতা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার মধ্যেও এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে দেশের অর্থনীতি ৭.৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতিবিদদের বড় অংশের পূর্বাভাসকে ছাপিয়ে গিয়েছে এই বৃদ্ধির হার। এমনকি রিজার্ভ ব্যাঙ্কও যেখানে ৭ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা বলেছিল, বাস্তবে তার চেয়ে অনেকটাই বেশি হয়েছে। ফলে চলতি অর্থবর্ষে সামগ্রিক বৃদ্ধির যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, তা আগামী দিনে সংশোধিত হয়ে আরও কিছুটা বাড়তে পারে।
এই পরিসংখ্যানের তাৎপর্য শুধু একটি ত্রৈমাসিকের উচ্চ বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে দেশের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ শক্তিরও কিছুটা প্রতিফলন রয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যখন অনিশ্চিত, তখনও শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রের কার্যকলাপ যথেষ্ট জোরালো থেকেছে। অর্থাৎ বাইরের প্রতিকূলতার ধাক্কা সত্ত্বেও দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং উৎপাদন ব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট সক্রিয়।
বিশেষভাবে নজর দেওয়ার মতো বিষয় হল উৎপাদন শিল্পের সাফল্য। প্রথম ত্রৈমাসিকে উৎপাদন ক্ষেত্রে বৃদ্ধি হয়েছে ৯.২ শতাংশ। নির্মাণ ক্ষেত্রেও ৭.৭ শতাংশ বৃদ্ধি অর্থনীতির গতি সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। সিমেন্ট উৎপাদন এবং ইস্পাতের ব্যবহার বৃদ্ধির মতো বিভিন্ন সূচকও এই প্রবণতাকে সমর্থন করছে।
এর অর্থ, পরিকাঠামো নির্মাণ এবং শিল্পক্ষেত্রে বিনিয়োগের চাহিদা এখনও
যথেষ্ট শক্তিশালী।
পরিষেবা ক্ষেত্রের ছবিটি আরও উজ্জ্বল। এই ক্ষেত্রে প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটেছে। আর্থিক পরিষেবা, আবাসন এবং পেশাদার পরিষেবা এই বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। সাম্প্রতিক সময়ে শিল্প ও পরিষেবা সংস্থাগুলির পরিচালন মুনাফা বৃদ্ধিও অর্থনীতির ভিত শক্ত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। উৎপাদন সংস্থাগুলির পরিচালন মুনাফা যেমন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, তেমনই তথ্যপ্রযুক্তি এবং অন্যান্য পরিষেবা সংস্থার মুনাফাতেও উন্নতি হয়েছে। এর ফলে সংস্থাগুলির বিনিয়োগের ক্ষমতা এবং ব্যবসায়িক আস্থা— দুই-ই বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
অর্থনীতির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হল সাধারণ মানুষের ভোগব্যয়। প্রথম ত্রৈমাসিকে ব্যক্তিগত ভোগব্যয় বেড়েছে ৭.১ শতাংশ। যাত্রীবাহী গাড়ি,
দু’চাকার যান এবং ট্রাক্টরের বিক্রি বৃদ্ধির মধ্যেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এই চাহিদা শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়; গ্রামীণ অর্থনীতিতেও তার কিছুটা প্রভাব রয়েছে। গ্রামীণ চাহিদা শক্তিশালী হলে সামগ্রিক অর্থনীতির ভিত আরও মজবুত হয়।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ইতিবাচক ছবি দেখা যাচ্ছে। শিল্পোৎপাদন সূচকে মূলধনী পণ্যের উৎপাদন ১৫ শতাংশ বেড়েছে। কেন্দ্রের মূলধনী ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্যের পরিকাঠামোগত ব্যয়ও বেড়েছে। সরকারি ব্যয় এবং বেসরকারি বিনিয়োগ— দুইয়ের সমন্বয় অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি বৃদ্ধির পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংক ঋণের প্রবাহও মোটামুটি শক্তিশালী রয়েছে। শিল্প এবং ভোগ— উভয় ক্ষেত্রেই ঋণের চাহিদা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখতে সাহায্য করছে।
কৃষিক্ষেত্রেও কিছুটা স্বস্তির খবর রয়েছে। বর্ষার পরবর্তী উন্নতি খরিফ ফসলের বপনে সহায়তা করেছে। বর্ষা শেষ পর্যন্ত স্বাভাবিক থাকলে গ্রামীণ আয় এবং চাহিদা আরও বাড়তে পারে। তবে এখানেই আবার অনিশ্চয়তার একটি বড় কারণ রয়েছে।
কারণ, বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধুমাত্র আশাবাদের চোখে দেখলে চলবে না। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক উত্তেজনা এবং ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এখনও যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত আরও বাড়লে জ্বালানির বাজারে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। ইতিমধ্যেই অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ভারত তার জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে মেটায়। ফলে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে আমদানি ব্যয়, মুদ্রাস্ফীতি এবং দেশের বাণিজ্য ঘাটতির উপর চাপ বাড়তে পারে।
দেশের অভ্যন্তরেও ঝুঁকি রয়েছে। আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব কৃষি উৎপাদনের উপর পড়লে গ্রামীণ অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বজায় রাখাও জরুরি।
তাই ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধির পরিসংখ্যান অবশ্যই স্বস্তির এবং উৎসাহের। কিন্তু এটিকে আত্মতুষ্টির কারণ বানানো উচিত নয়। ভারতের অর্থনীতির ভিত যে আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান তার প্রমাণ দেয়। এখন প্রয়োজন এই গতি ধরে রাখা। প্রথম ত্রৈমাসিকের ফলাফল তাই আশার আলো দেখাচ্ছে। সেই আলোকে স্থায়ী উন্নয়নের পথে নিয়ে যাওয়াই এখন নীতি-নির্ধারকদের প্রধান দায়িত্ব।