কৃত্রিম মেধা (Artificial Intelligence) ও রোবটিক্সের (Robotics) দাপটে ২০৩৬ সালের মধ্যেই টাকার কোনও গুরুত্ব থাকবে না বলে চাঞ্চল্যকর দাবি করলেন টেসলা ও স্পেসএক্সের কর্ণধার ইলন মাস্ক। দ্য ইকোনমিস্টের (The Economist) সম্পাদক জানি মিন্টন বেডোজকে সম্প্রতি দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে মাস্কের যুক্তি, খাদ্য-বাসস্থান-পরিবহন কিংবা বিনোদনের জন্যই মূলত মানুষ অর্থ চায়। রোবট ও এআই যদি মানুষের প্রয়োজনের চেয়েও বেশি পণ্য ও পরিষেবার জোগান দিতে পারে, তা হলে অর্থের প্রয়োজনীয়তাই আর থাকে না। তিনি এই আসন্ন পরিস্থিতিকে ‘অভূতপূর্ব প্রাচুর্য’ বা ‘ইনক্রেডিবল অ্যাবানডান্স’ (Incredible Abundance) বলে বর্ণনা করেছেন।
মুদ্রা সঙ্কোচনের ভবিষ্যদ্বাণী
চিরাচরিত ধারণাকে উল্টে দিয়ে মাস্কের দাবি, আগামী দিনে মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) নয়, বরং মুদ্রা সঙ্কোচনই (Deflation) হবে অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ। কারণ রোবট ও এআই-চালিত উৎপাদন এত দ্রুত বাড়বে যে তা মুদ্রা সরবরাহের গতিকেও ছাপিয়ে যাবে। এই রূপান্তর মসৃণ হবে না বলেও স্বীকার করেছেন তিনি। পাশাপাশি নাগরিকদের হাতে সরাসরি সরকারি অনুদান পৌঁছে দেওয়াই যে আগামী দিনের প্রধান নীতিগত লড়াই হয়ে উঠবে, সে ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি।
অর্থনীতিবিদদের সংশয়
তবে মাস্কের এই ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন একাধিক অর্থনীতিবিদ। তাঁদের যুক্তি, রোবট সস্তায় পণ্য তৈরি করলেও প্রকৃত দুষ্প্রাপ্যতা কখনওই মুছে যায় না, শুধু তার চরিত্র বদলায়। নির্দিষ্ট এলাকার একটি বাড়ি, নামী স্কুলে একটি আসন কিংবা প্রভাবশালী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ, এই ধরনের দুষ্প্রাপ্য বিষয়গুলি চিরকালই সীমিত থেকে যাবে বলে মত তাঁদের। প্রশ্ন উঠেছে পরিচালন কাঠামো নিয়েও, হাতে গোনা কয়েকটি সংস্থার হাতেই যদি রোবট ও শক্তি পরিকাঠামোর মালিকানা কেন্দ্রীভূত থাকে, তা হলে প্রাচুর্যের সুষম বণ্টন এমনিতেই ঘটবে না বলে সতর্ক করেছেন তাঁরা। উল্লেখযোগ্য বিষয়, মাস্কের নিজের সংস্থা টেসলার বাজারমূল্যই এখনও নির্ভর করছে বিনিয়োগকারীদের সেই টাকার উপরে, যাকে তিনি নিজেই অপ্রাসঙ্গিক বলছেন।
যে প্রেক্ষাপটে এই মন্তব্য
লক্ষণীয় বিষয়, গত কয়েক সপ্তাহে টেসলা ও স্পেসএক্সের শেয়ারদরে বড়সড় ধস নামার পরেই এই মন্তব্য করেছেন মাস্ক, যাঁর ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৭০০ বিলিয়ন ডলার কমে গিয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই প্রেক্ষিতেই তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী ঘিরে বাড়তি কৌতূহল তৈরি হয়েছে সমাজমাধ্যমে। এআই প্রযুক্তির অগ্রগতি নিয়ে নিজের মিশ্র প্রতিক্রিয়ার কথাও স্বীকার করেছেন তিনি, জানিয়েছেন উত্তেজনা ও উদ্বেগের দোলাচল একই দিনে বদলে যায় তাঁর মনে।
বেকার বাড়বে?
কলকাতার সল্টলেক সেক্টর ফাইভ (Sector V) কিংবা রাজারহাটের তথ্যপ্রযুক্তি হাবে বহু তরুণ-তরুণী নিযুক্ত আছেন যে ধরনের কাজে, এআই ও অটোমেশনের ক্ষেত্রে এ ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী তাঁদের কাছেও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে। প্রাচুর্যের যুগ আদৌ কবে আসবে তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, স্বল্প মেয়াদে চাকরি হারানোর আশঙ্কা এবং দক্ষতা অর্জনের (Reskilling) প্রয়োজনীয়তা যে বাড়ছে, তা নিয়ে একমত বিশ্বজুড়ে বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ। রাজ্যের তথ্যপ্রযুক্তি নীতিনির্ধারক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির কাছে তাই এই ধরনের আন্তর্জাতিক প্রবণতা নজরে রাখা এবং তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাঠ্যক্রম ঢেলে সাজানোর প্রশ্নটি আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।