দেশজুড়ে ডিজিটাল লেনদেনের রমরমা বাড়লেও বাস্তব জীবনে খুচরো টাকার সঙ্কট ক্রমেই আরও তীব্র হয়ে উঠছে। বিশেষ করে দৈনন্দিন বাজার-হাট, পাড়ার দোকান, চায়ের দোকান, বাস-অটো ভাড়া, ছোটখাটো কেনাকাটায় ৫০ ও ১০০ টাকার নোটের অভাব সাধারণ মানুষের ভোগান্তির অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটিএম থেকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শুধু ৫০০ টাকার নোট মিলছে। ফলে হাতে টাকা থাকলেও খুচরো না থাকার জন্য দোকানে দোকানে ঘুরে নাকাল হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
কলকাতা, দিল্লি, মুম্বইয়ের মতো মহানগরেও ১০ ও ২০ টাকার নোট পাওয়া এখন কার্যত চ্যালেঞ্জ। বহু ক্ষেত্রে যে ক’টা ছোট নোট পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলিও ছেঁড়া, ময়লা বা ব্যবহার অযোগ্য অবস্থায় থাকে। দোকানদার থেকে শুরু করে রিকশাচালক, অটোচালক, পথবিক্রেতা—সকলেরই একই অভিযোগ, ‘খুচরো নেই’। এর জেরে নিত্যদিনের লেনদেনে অস্বস্তি বাড়ছে, ঝামেলায় পড়ছেন ক্রেতা ও বিক্রেতা—দু’পক্ষই।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে এ বার বিশেষ পদক্ষেপের পথে হাঁটতে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার। ছোট অর্থমূল্যের ব্যাঙ্ক নোট সাধারণ মানুষের হাতে সহজে পৌঁছে দিতে ‘হাইব্রিড এটিএম’ চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই ধরনের এটিএম থেকে সরাসরি ১০, ২০ ও ৫০ টাকার নোট তোলা যাবে। শুধু তাই নয়, বড় অঙ্কের নোট জমা দিয়ে তা ভেঙে ছোট নোটে নেওয়ার ব্যবস্থাও রাখার কথা ভাবা হচ্ছে, যাতে মানুষ সহজেই খুচরো টাকা সংগ্রহ করতে পারেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে বাণিজ্যিক এলাকা, ব্যস্ত বাজার, হাসপাতাল চত্বর, বাস টার্মিনাস, রেল স্টেশন, মেট্রো স্টেশন এবং গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াত কেন্দ্রগুলিতে এই হাইব্রিড এটিএম বসানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই মুম্বইয়ে একটি পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, পরীক্ষামূলক প্রকল্প সফল হলে ধাপে ধাপে দেশের বিভিন্ন শহর ও জেলায় এই হাইব্রিড এটিএম চালু করা হবে।
যদিও কেন্দ্রীয় সরকার ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করার দিকে জোর দিচ্ছে, তবু বাস্তব পরিস্থিতিতে এখনও বিপুল সংখ্যক মানুষ নগদ লেনদেনের উপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে ছোট ব্যবসায়ী, দিনমজুর, পথবিক্রেতা, গ্রামীণ এলাকার মানুষ এবং বয়স্ক নাগরিকদের কাছে নগদ টাকাই এখনও ভরসা। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ডিজিটাল ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে বাস্তব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, খুচরো নোটের সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাও সমান জরুরি।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ছোট নোটের সরবরাহ কাঠামো ঠিক না হলে এই হাইব্রিড এটিএম ব্যবস্থাও দীর্ঘমেয়াদে কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তবু সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ভোগান্তি কমাতে এই উদ্যোগকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন অনেকেই।
সব মিলিয়ে, ডিজিটাল লেনদেনের যুগে দাঁড়িয়েও খুচরো টাকার বাস্তব সংকট যে সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলছে, সেই বাস্তবতাকেই স্বীকার করে নিয়ে কেন্দ্রের এই নতুন উদ্যোগ। হাইব্রিড এটিএম প্রকল্প বাস্তবে রূপ পেলে নিত্যদিনের ছোট লেনদেনে স্বস্তি ফিরবে বলেই আশা করা হচ্ছে।