আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বিরাট অস্থিরতা এবং ভূ-রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের শক্তি নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখল রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড তথা বিপিসিএল (Bharat Petroleum Corporation Limited, BPCL)। চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে আমেরিকা-ইরান সংঘাতের জেরে অশোধিত তেলের দাম, জাহাজভাড়া ও বিমার খরচ যখন আকাশছোঁয়া, ঠিক তখনই গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে সেই বাড়তি বোঝা নিজের কাঁধে তুলে নিল সংস্থা।
পরিষেবায় অটুট প্রতিশ্রুতি
সংস্থার আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, বিপিসিএলের পরিচালন আয় (Revenue from Operations) বছরের নিরিখে ২৩ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লক্ষ ৫৯ হাজার ৫২৭ কোটি টাকায়। শোধনাগারে অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণের পরিমাণ তথা রিফাইনারি থ্রুপুট (Refinery Throughput) ছিল ১০.১৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন, ক্ষমতার ১১৫ শতাংশ কাজে লাগিয়ে। দেশীয় বাজারে বিক্রি হয়েছে ১৩.৬২ মিলিয়ন মেট্রিক টন জ্বালানি। সংস্থার চিফ ম্যানেজিং ডিরেক্টর সঞ্জয় খান্না (CMD Sanjay Khanna)জানিয়েছেন, পরিশোধনাগার, বিপণন এবং বণ্টন নেটওয়ার্ক জুড়ে নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম বজায় রেখে শহর, শিল্পাঞ্চল এবং গ্রামীণ বাজারে পেট্রোলিয়াম পণ্যের জোগান অব্যাহত রেখেছে সংস্থা। পাশাপাশি পাইপলাইন সংযোগ, সিটি গ্যাস বণ্টন, ডিজিটাল পরিকাঠামো এবং নতুন প্রজন্মের জ্বালানি ব্যবসাতেও বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে বিপিসিএল।
গ্রাহকদের স্বার্থে অগ্রাধিকার
আন্তর্জাতিক অস্থিরতার আঁচ পুরোপুরি গ্রাহকদের ঘাড়ে না চাপিয়ে, প্রায় তিন মাস ধরে পেট্রল, ডিজেল ও রান্নার গ্যাস তথা এলপিজি-র (LPG) দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সংস্থা। এই সিদ্ধান্তের প্রত্যক্ষ প্রভাবে সংস্থার পরিচালন মুনাফা তথা এবিটডা (EBITDA) এবং নিট মুনাফার অঙ্কে এই ত্রৈমাসিকে ধাক্কা লাগলেও, আমজনতার হেঁশেল ও যাতায়াতের খরচে কোনও আঁচ পড়তে দেয়নি বিপিসিএল। শোধনাগার মার্জিন কিছুটা চাঙ্গা থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে বিপণন মার্জিন বা মার্কেটিং মার্জিন (Marketing Margin) সঙ্কুচিত হয়েছিল, যা আসলে গ্রাহক-স্বার্থে সংস্থার একটি সচেতন কৌশলগত অবস্থানের প্রতিফলন বলেই মনে করছেন শিল্পমহলের একাংশ। একই পথে হেঁটেছে দেশের অন্য দুই রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি সংস্থা ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন (Indian Oil Corporation, IOC) এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেডও (Hindustan Petroleum Corporation Limited, HPCL), প্রমাণ করেছে দেশের জ্বালানি ক্ষেত্রের স্তম্ভগুলি সংকটেও অবিচল।
পশ্চিমবঙ্গের গ্রাহকদের জন্য স্বস্তি
পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বিপিসিএলের বিস্তৃত খুচরো নেটওয়ার্ক রয়েছে। রাজ্যের একাধিক পেট্রল পাম্প ও এলপিজি ডিস্ট্রিবিউটরশিপের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবা পেয়েছেন রাজ্যের গাড়িচালক থেকে রান্নার গ্যাসের গ্রাহকরা। আন্তর্জাতিক বাজারের উত্থানপতনের মধ্যেও রাজ্যে জ্বালানি সরবরাহে কোনও ঘাটতি বা মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা লাগেনি, যা সংস্থার সংকটকালীন সঙ্কল্পেরই প্রতিফলন। শিল্পমহলের ব্যাখ্যা, স্বল্পমেয়াদি লাভের অঙ্ক বিসর্জন দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা ও গ্রাহক-আস্থা ধরে রাখার এই কৌশলই সংস্থাকে সংকটেও নির্ভরযোগ্য করে তুলেছে।
উন্নত পরিকল্পনা ব্যবস্থা, ডিজিটাল নজরদারি এবং প্রকৃত সময়ের সরবরাহ সমন্বয়কে কাজে লাগিয়ে পরিবর্তনশীল চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশ জুড়ে জ্বালানি সরবরাহে ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে বিপিসিএল, যা প্রতিকূল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতেও সংস্থার স্থিতিস্থাপকতারই প্রমাণ।