অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ভু-রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির জেরে গত সপ্তাহে বিশ্বব্যাপী পতন হয়েছে শেয়ার বাজারের। আমেরিকা এবং ইরানের মাঝে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি এবং হরমুজে একের পর এক দুই যুদ্ধরত দেশের ট্যাঙ্কারের উপর আক্রমণের ফলে আকাশ ছুঁয়েছে অপরিশোধিত তেলের দাম। গত এক মাসে প্রায় কুড়ি শতাংশেরও বেশি বেড়েছে অপরিশোধিত তেলের দাম। গত সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেল পিছু বন্ধ হয়েছে প্রায় ১০৪ ডলারের আশেপাশে, যা ভারতের কমফোর্ট লেভেল থেকে অনেকটাই বেশি। ফলে অর্থনৈতিক চাপ এসেছে দেশের ব্যালেন্স অফ পেমেন্টে। এর সঙ্গে রয়েছে মুদ্রাস্ফীতি যা সমগ্র বিশ্বের কাছে অশনি সংকেতের স্বরূপ। এর ফলে হু-হু করে বেড়েছে বিভিন্ন দেশের বন্ডের সুদের হার, পতন হয়েছে ইকুইটি সূচকের। ভারতের বাজারে গত সপ্তাহে দুই প্রধান সূচক নিফটি এবং সেনসেক্সের পতন হয়েছে বেশ অনেকটাই।
গত সপ্তাহের পতনের হাত থেকে রেহাই পায়নি মিড ক্যাপ সূচকও। গত কয়েক সপ্তাহে ভালো পারফরম্যান্স দেবার পরেও গত সপ্তাহে পতন হয়েছে স্মল ক্যাপ সূচকের, যা গত সপ্তাহের বন্ধের ভিত্তিতে প্রায় ০.৯৪ শতাংশ নীচে। এর ফলে বাজারের অ্যাডভান্স ডিক্লাইন রেশিও খারাপ হয়েছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা হারিয়েছে আত্মবিশ্বাস। বাজারের ভোলাটালিটি বেশি হবার ফলে ইন্ডিয়া ভিক্স গত সপ্তাহে প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়ে বন্ধ হয়েছে ১২.২৯ শতাংশের আশেপাশে। সিপিএসই এবং ফার্মা সূচক গত সপ্তাহে সামান্য উপরে বন্ধ হলেও বাকি সমস্ত সূচকের অবস্থা বেশ খারাপ ছিল গত সপ্তাহে। বিশেষত রিয়ালিটি, আইটি, মিডিয়া, মেটাল এবং কমোডিটি সেক্টরের সূচকের হাল বেশ খারাপ। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা গত সপ্তাহে বিক্রেতার ভূমিকায় থাকলেও তাদের সামগ্রিক বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৭৯৫ কোটি টাকার মতো৷ দেশীয় বিনিয়োগকারীরা যথারীতি ক্রেতার ভূমিকায়, তাদের মোট কেনার পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৪১৯ কোটি টাকার মতো।
পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা জেরে এবং অপরিশোধিত তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির জন্য সমগ্র বিশ্বে মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে এর ফলে সুদ বাড়তে পারে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। গত সপ্তাহে আমেরিকার প্রধান তিন সূচক বন্ধ হয়েছে বেশ কিছুটা নীচে। ইউরোপের বাজার ও সাপ্তাহিক বন্ধের ভিত্তিতে বেশ কিছুটা নিচে বন্ধ হয়েছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া-সহ বিভিন্ন এশিয়ান কান্ট্রিগুলির সূচক এই পতনের হাত থেকে রেহাই পায়নি। হংকংয়ের সূচক গত সপ্তাহে প্রায় ৩ শতাংশ নীচে বন্ধ হয়েছে। সোনা এবং রুপো এই দুই মূল্যবান ধাতু গত সপ্তাহে কিছুটা নীচে বন্ধ হলেও মোটের উপর এই দুই মূল্যবান ধাতুর দামের সেরকম বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বিক্রির চাপে গত সপ্তাহে ডলার বন্ধ হয়েছে কিছুটা উপরে। বর্তমানে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়ের পরিমাণ প্রায় ৭৮৫ বিলিয়ন ডলার, যা একটি সর্বকালীন রেকর্ড। এত বেশি পরিমাণ বিদেশী মুদ্রা থাকার ফলে টাকার দাম ডলারের সাপেক্ষে কিছুটা স্বস্তিতে থাকবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যাচ্ছে একদিকে যেমন বাজারের পতন বিনিয়োগকারীকে ভাবিয়ে তুলেছে অন্যদিকে বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভ্যালুয়েশনের দিক থেকে ভারতের বাজার বেশ আকর্ষণীয়। ফলে বিনিয়োগকারীরা এই সুযোগের সৎ ব্যবহার করতে পারেন। আবার অনেকে বলছেন বাজারের পতন চলবে আরও কিছুটা। কিন্তু বাজারের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে এই সমস্ত মতামত অধিকাংশ সময়ই বিনিয়োগকারীদের কাজে আসে না। বাজারে সফল বিনিয়োগকারী হবার ফর্মুলা খুব সহজ।
আপনাকে বাজারের পতনের সুযোগে কিনতে হবে ভালো স্টক কিংবা মিউচুয়াল ফান্ড। আর আপনার বিনিয়োগকে ছড়িয়ে দিতে হবে বিভিন্ন অ্যাসেট ক্লাসের মধ্যে। শেয়ার বা মিউচুয়াল ফান্ড যাই হোক না কেন কিংবা অ্যাসেট অ্যালোকেশনের ব্যাপারে পরামর্শ নিন বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞদের থেকে। এই দুইয়ের সমন্বয়ে বাজারের যে কোনও পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ বৈতরণী পার হতে খুব বেশি বেগ পেতে হবে না বিনিয়োগকারীকে। কেবল বাজারকে দিতে হবে সময়। মনে রাখবেন ‘Time in the Market is more Important than Timing of Market’৷