পাহাড়ে পরিবর্তনের হাওয়া। প্রশাসনে স্বচ্ছতা ফেরাতে এবং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দুর্নীতি উপড়ে ফেলতে একযোগে আসরে নামলেন রাজ্যের স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী (Minister of State for Home and Hill Affairs) বিশাল লামা এবং দার্জিলিংয়ের সাংসদ (Darjeeling MP) রাজু বিস্তা। উত্তরকন্যায় (Uttarkanya) আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় বৈঠকে (Coordination Meeting) জিটিএ-র বিগত কয়েক মাসের কাজকর্ম পর্যালোচনার পর প্রায় ২০০ কোটি টাকার ডিপিআর (Detailed Project Report) বাতিলের এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জিটিএ-র রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়া মাফিয়ারাজ ও আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা। বর্ষার মরসুমে পাহাড়ে ধস নামার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলা (Natural Disaster Management) এবং পরিকাঠামো সংস্কারের লক্ষ্যেই মূলত এই জরুরি বৈঠকটি ডাকা হয়েছিল।
লক্ষ্য এবার প্রকৃত উন্নয়ন
বৈঠক শেষে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে জিটিএ-তে চলা দীর্ঘদিনের দুর্নীতির খতিয়ান তুলে ধরেন মন্ত্রী বিশাল লামা। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, বিগত দিনে পাহাড়ের সাধারণ মানুষের স্বার্থকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কেবল কিছু বিশেষ ঠিকাদার এবং রাজনৈতিক নেতাদের পকেট ভরাতেই এই সব ডিপিআর (DPR) তৈরি করা হয়েছিল। জনগণের কোনও কাজেই আসত না সেগুলি। তাই সাধারণ মানুষের করের টাকা বাঁচাতে এবং প্রশাসনে শুদ্ধিকরণ আনতে প্রায় ২০০ কোটি টাকার ডিপিআর বাতিল করে একটি বড়সড় ‘সাফাই অভিযান’ (Clean-up Drive) শুরু করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক (Ministry of Home Affairs) ও মুখ্যমন্ত্রী কার্যালয় (Chief Minister’s Office-CMO) থেকে চূড়ান্ত সবুজ সংকেত মেলার পরেই পাহাড়ের বুকে নতুন করে এবং দ্রুত গতিতে প্রকৃত জনমুখী পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ শুরু হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
বঞ্চনার অবসান চান সাংসদ
দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা পাহাড়ের মানুষের সমান অধিকার ও বঞ্চনার অবসান নিয়ে তীব্র সওয়াল করেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্বাধীনতার এত বছর পরেও পাহাড়ের বহু প্রত্যন্ত গ্রামে পানীয় জল (Drinking Water) নেই, রাস্তাঘাট বিধ্বস্ত এবং যোগাযোগের জন্য ন্যূনতম ব্রিজটুকুও তৈরি করা হয়নি। দেশের অন্যান্য উন্নত রাজ্য বা সমতলের জেলার মতো পাহাড়ের মানুষও যাতে সমান সুযোগ-সুবিধা পান, তা সুনিশ্চিত করাই আমাদের সরকারের মূল লক্ষ্য।
এই লক্ষ্যপূরণে এবার পাহাড়ে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ বরাদ্দের কথা ঘোষণা করেন সাংসদ। জিটিএ-র (Gorkhaland Territorial Administration-GTA) নিজস্ব ৩৬০ কোটি টাকার বাজেটের পাশাপাশি এবার উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তর (North Bengal Development Department) থেকেও অতিরিক্ত ২৫০ কোটি টাকা দেওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, যা পাহাড়ের ইতিহাসে আগে কখনও ঘটেনি।
তদন্তের মুখে মাফিয়া-চক্র
পাহাড়, শিলিগুড়ি এবং তরাই-ডুয়ার্স জুড়ে সক্রিয় থাকা বিভিন্ন সিন্ডিকেট ও মাফিয়া-চক্রের (Mafia Rackets) বিরুদ্ধে এদিন চরম হুঁশিয়ারি দেন রাজু বিস্তা। তিনি জানান, ১ কোটি টাকার বেশি মূল্যের প্রায় ৫০টি বড় প্রকল্পের ওপর সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলি বর্তমানে নিজস্ব স্তরে বিশেষ অডিট (Departmental Audit) এবং অভ্যন্তরীণ তদন্ত চালাচ্ছে। বিশেষত, প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য আসা কেন্দ্রীয় ও রাজ্যের বিপুল অর্থ কোথায় কীভাবে খরচ হয়েছে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই বিপুল আর্থিক অনিয়মের (Financial Irregularities) তদন্তভার সিএজি (CAG), ইডি (ED) অথবা সিবিআই (CBI)-এর মতো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হবে। সে বিষয়ে সরকার খুব দ্রুত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
পাহাড়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা
জিটিএ-তে বর্তমানে কোনও নির্বাচিত বোর্ড না থাকা এবং পাহাড়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশ (Democratic Atmosphere) নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্নের জবাবে পূর্বতন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে (Trinamool Congress) তীব্র আক্রমণ করেন সাংসদ। তিনি তোপ দেগে বলেন, এতদিন ধরে অগণতান্ত্রিক উপায়ে যেভাবে জিটিএ চালানো হয়েছে, তখন কেউ গণতন্ত্রের পক্ষে সওয়াল করেনি। ২০২৬ সালের নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) জয় এবং নতুন সরকার গঠন আসলে পাহাড়ে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠারই পথ প্রশস্ত করেছে। জিটিএ-কে একটি নির্বাচিত মিনি-সরকার (Mini-Government) হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, এর মর্যাদাকে পূর্ণ সম্মান দিয়ে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই সমস্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।